মহার্ঘভাতা (ডিএ) নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বনাম রাজ্য সরকারের দীর্ঘ দিনের সংঘাত এ বার আরও জটিল রূপ নিল। সপ্তম বেতন কমিশনের আওতায় থাকা কর্মীদের ডিএ নিয়ে টানাপড়েন তো ছিলই, কিন্তু পুরনো বেতন কাঠামোয় আটকে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য যে আকাশছোঁয়া, তা প্রকাশ্যে এল সাম্প্রতিক নির্দেশে। কেন্দ্রের পঞ্চম বেতন কমিশনের আওতাধীন কর্মীরা যখন ৪৯৭ শতাংশ হারে ডিএ পাচ্ছেন, ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গের চতুর্থ বেতন কমিশন (রোপা ৯৮)-এর আওতায় থাকা কর্মীরা গত তিন বছর ধরে কেন্দ্রের ধারেকাছেও ডিএ বৃদ্ধি পাচ্ছেন না বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
রাজ্য সরকারি কর্মচারী সংগঠনের একাংশের দাবি, কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের মানসিকতার ফারাক এই নির্দেশের ফলেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রে এখনও যে সমস্ত কর্মী সপ্তম বেতন কমিশনে অন্তর্ভুক্ত হননি এবং পঞ্চম বেতন কমিশনের নিয়মে বেতন নিচ্ছেন, তাঁদের ডিএ-র হার প্রায় ৫০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে যা সমতুল্য অর্থাৎ চতুর্থ বেতন কমিশন বা ‘রোপা ১৯৯৮’-এর আওতায় যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। অভিযোগ, ২০১৯ সালের পর থেকে রাজ্যের অর্থ দফতর এই কর্মীদের ডিএ পুরোপুরি ‘ফ্রিজ’ বা আটকে রেখেছে। ফলে কেন্দ্রীয় হারে প্রাপ্য ডিএ যেখানে ৪৯৭ শতাংশে ঠেকেছে, সেখানে রাজ্যের এই কর্মীরা আটকে রয়েছেন মাত্র ২১৩ শতাংশের ঘরে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এই বৈষম্যের কৌশল নিয়েও সরব হয়েছেন কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, সরকার সরাসরি ডিএ বাতিলের কথা ঘোষণা না করলেও বিজ্ঞপ্তির ভাষায় চালাকি করছে। নতুন ডিএ ঘোষণার সময় রোপা ২০০৯ বা রোপা ২০১৯-এর কথা উল্লেখ করা হলেও কৌশলে রোপা ১৯৯৮-এর উল্লেখ বাদ রাখা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই ওই স্তরের কর্মীদের ডিএ আর বৃদ্ধি পাচ্ছে না।
আরও পড়ুন:
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই বেতনক্রমে কর্মরত কর্মী হাতে গোনা হলেও বিপুল সংখ্যক প্রবীণ পেনশনভোগী রয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মীদের একটি বড় অংশের বয়স বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ পেরিয়েছে। তাঁদের এই বয়সে এসে এমন আর্থিক বঞ্চনার শিকার হতে হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কর্মীদের বক্তব্য, রাজনৈতিক পালাবদল বা সরকার পরিবর্তনের পরেও এই অংশের কর্মচারীদের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। তৃণমূল সরকারের আমলে ২০২৩ সালে এই বঞ্চনার সূত্রপাত হয়েছিল, যা পরবর্তী নির্দেশেও বহাল থেকে গিয়েছে। রোপা ২০০৯ বা রোপা ২০১৯-এর আওতাধীন কর্মীদের জন্য ২০ শতাংশ ডিএ ঘোষণার প্রসঙ্গ এলেও রোপা ৯৮-এর আওতাভুক্ত প্রবীণদের কথা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তারা কেন্দ্রীয় কর্মীদের ক্ষেত্রে পুরনো পে-কমিশনের নিয়মেও নিয়মিত ডিএ বাড়িয়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখাচ্ছে। অথচ রাজ্যে সেই একই ক্যাটাগরির কর্মীদের দিনের পর দিন বঞ্চিত রাখা হচ্ছে বলে দাবি কর্মচারী মহলের। শেষ বয়সে এসে এই বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে কেন্দ্রের ধাঁচে অবিলম্বে বকেয়া ডিএ চালুর দাবি জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘আমাদের রাজ্যে যাঁরা রোপা ৯৮ অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন, তাঁরা কেন্দ্রের পঞ্চম বেতন কমিশনের সমতুল্য। কেন্দ্র পঞ্চম বেতন কমিশনের আওতায় থাকা কর্মীদের নিয়মিত ডিএ এবং ডিআর বৃদ্ধি করলেও আমাদের রাজ্য সরকার রোপা ৯৮ এর অন্তর্ভুক্ত কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের সেই ২০১৯ সালের পর থেকে ডিএ ফ্রিজ করে দিয়েছে। তাঁরা মাত্র ২১৩ শতাংশ ডিএ বা ডিআর পাচ্ছেন। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পেনশনভোগীরা। তৃণমূল সরকার যে লাইনে চলছিল বর্তমান রাজ্য সরকার সেই একই লাইনে চলছে।’’
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মচারী পরিষদের নেতা দেবাশিস শীল বলেন, ‘‘রোপা ৯৮-এ ডিএ বঞ্চনার কথা বলা হচ্ছে। রোপা ৯৮ যখন হয়েছিল, তখন তো বামফ্রন্ট সরকার ছিল। বাম সরকার তো কোনও দিনই কেন্দ্র যে পরিমাণ ডিএ দিয়েছে, তা দেয়নি। তবুও বাম সরকারের আমলে মোটামুটি একটা ডিএ বছরে নিয়ম করে দেওয়া হচ্ছিল, যদিও কেন্দ্রের সঙ্গে ব্যবধান ছিল। আর তারপরে যে ১৫ বছর তৃণমূল সরকার, সে তো খাপ পঞ্চায়েতের মতো— যখন মনে হল তখন ডিএ দিত।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বর্তমান বিজেপি সরকার পাঁচ মাসের মধ্যে একবারে ২০% দিল। রোপা ৯৮-এর বঞ্চনা, ডিএ বঞ্চনা— এ তো আজকের গল্প নয়, ৩৪+১৫=৪৯ বছরের বঞ্চনার গল্প। হঠাৎ এই সরকারের উপর কেন দায় তার আরোপ করা হচ্ছে, আমি তো বুঝতে পারছি না। ২০ শতাংশ ডিএ সবাই পেয়েছেন— পেনশনভোগী এবং সরকারি কর্মচারী যাঁরা সার্ভিসে আছেন— তাঁরা এটা উপভোগ করুন। কারণ, জীবনে কোনও দিন একসঙ্গে ২০% ডিএ পেয়ে দেখেননি। এই প্রথম দেওয়া হল। আগামী বছরের ফিনান্সিয়াল ইয়ারের শেষের মধ্যেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে সেন্ট্রালের সঙ্গে আমাদের ব্যবধানটা অনেক কমে যাবে। তখন বঞ্চনার গল্পটা আর বেশি বলা যাবে না।’’