স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ‘কেলেঙ্কারি’র ব্যাপকতা খুঁজে বার করার ভার আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করা কোনও সংস্থার হাতে তুলে দিতে চায় রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠক করে এ কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী সময় চেয়েছেন। শারদ্বত জানান, মুখ্যমন্ত্রী অনুমতি দিলে ‘কেলেঙ্কারি’ সম্পর্কিত নথি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যবিমা ঘিরে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতিতে দফতরের নিচুতলার কর্মীরাও যুক্ত বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মতো স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পেও ‘ভুয়ো উপভোক্তা’র তালিকা তৈরি করে কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়টি গত বৃহস্পতিবার প্রথম প্রকাশ্যে আসে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সে দিন বলেছিলেন, ‘‘প্রাথমিক ভাবে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ধরা পড়েছে!’’ সেটি ছিল প্রাথমিক হিসাব। এর পর চারদিন কেটে গিয়েছে। মঙ্গলবার শারদ্বত বলেন, ‘‘স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে যে ভাবে দুর্নীতি হয়েছে, তাতে আমাদের কোনও তদন্তকারী সংস্থা লাগবে।’’ কেন তদন্তকারী সংস্থার প্রয়োজন? স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে দুর্নীতির সব অভিমুখ ধরে তদন্ত করা স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষে কঠিন। তাঁর কথায়, ‘‘এ ধরনের আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করার মতো সময় আমাদের নেই। পারদর্শিতাও নেই। আমি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সময় চেয়েছি। আমরা স্বাস্থ্যসাথীর ফাইল তৈরি করে ফেলেছি। মুখ্যমন্ত্রী সময় দিলে আমরা এই ফাইল নিয়ে তাঁর কাছে যাব। মুখ্যমন্ত্রী অনুমতি দিলে স্বাস্থ্যসাথীর ১০ বছরের দুর্নীতির তদন্ত একটি তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার কথা আমরা ভাবছি।’’
তৃণমূল আমলেই স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে একাধিক নার্সিংহোম যে অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে তা সামনে এসেছে। সেই সকল অভিযোগের প্রেক্ষিতে অ্যাডভাইজ়ারি জারি করে নার্সিংহোমগুলির কার্যকলাপের উপরে রাশ টানা হলেও, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলিকে তৃণমূলের নেতৃত্বাধীন স্বাস্থ্য প্রশাসন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দাবি করে এসেছে। অনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধে তৃণমূল আমলে নার্সিংহোম, চিকিৎসকদের একাংশের ভূমিকা নিয়ে স্বাস্থ্য ভবন ‘সন্দিহান’ হলেও, প্রকল্পের টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রশ্নে মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলির (টিপিএ) বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
রাজ্যে পালাবদলের পরে স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, এই সংস্থাগুলিই ছিল ৩০ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারির চালিকাশক্তি! তাঁদের মতে, সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এই কাজ করা হয়েছে। বিজেপি সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা বলছেন তাতে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ‘কেলেঙ্কারি’কে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির আরও একটি নজির বলা যেতে পারে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘আমাদের নিচুতলার আধিকারিক থেকে শুরু করে হাসপাতাল, উপভোক্তা, ডাক্তার এমনকি রোগীর বাড়ির লোকও এতে যুক্ত রয়েছে।’’ তিনি জানান, রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের তরফে যে তদন্ত হয়েছে তাতে দেখা গিয়েছে, মৃত ব্যক্তির কার্ড ব্যবহার করে একাধিক বার ভুয়ো বিল তৈরি করা হয়েছে। এ ধরনের বিল ধরার দায়িত্ব ছিল টিপিএ সংস্থাগুলির। কিন্তু সেই সংস্থাগুলিই এ ধরনের বিল অনুমোদনে সাহায্য করেছে। শারদ্বতের কথায়, ‘‘এমনও ঘটনা জানতে পেরেছি, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন উপভোক্তা মারা গিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, মৃত্যুর তিন-চার বছর পরে মৃত ব্যক্তি আবার চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন! মৃত ব্যক্তির অস্ত্রোপচারও হয়েছে। সেই অপারেশনের বিল স্বাস্থ্য দফতরে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। এ রকম বারবার হয়েছে। বাড়ির লোকেরা যুক্ত না-থাকলে মৃত ব্যক্তির কার্ড সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ পেলেন কী করে!’’
আরও পড়ুন:
স্বাস্থ্যসাথী শুধু নয়, প্রসূতি মায়েদের জন্য ‘নিশ্চয় যান’ প্রকল্পে যে অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা রয়েছে, সেখানেও ভুয়ো নথির হাত ধরে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরের কার্যকলাপকে বিঁধে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘এই ভুয়ো বিল, ভুয়ো উপভোক্তা এ নিয়ে সত্যি বলতে আর ধৈর্য রাখতে পারছি না। অধৈর্য হয়ে গিয়েছি। এই ধরপাকড় কি স্বাস্থ্য দফতরের কাজ?’’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘যদি কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকে, তা হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। সকলের ভুল ধরছেন ভাল। শুধু দেখে নেবেন এই করতে গিয়ে কারও আত্মীয় না ভাল পোস্টিং পেয়ে যান!’’