চোরবাগানের মণ্ডপে পদপিষ্টের ঘটনা কী ভাবে, কেন, কার বা কাদের গাফিলতিতে ঘটেছিল— সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জোরকদমে তদন্ত শুরু হয়েছে। কলকাতা পুলিশ ছাড়াও ঘটনার তদন্ত করছে রাজ্য সরকারের গড়ে দেওয়া বিশেষ তদন্তকারী দলও (সিট)। বৃহস্পতিবার দিনভর ওই মণ্ডপে পুলিশ, ফরেনসিক থেকে রাজ্যের সিটের সদস্যদের আনাগোনা ছিল। অন্য দিকে, এই চোরাবাগান কাণ্ডে বাড়ল গ্রেফতারির সংখ্যাও। বিশৃঙ্খলার সময় ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়া’র ঘোষণা করার সন্দেহে এক জনকে নদিয়া থেকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
প্রথম সপ্তমীতে অর্থাৎ শনিবার রাতের দিকে চোরবাগানের মণ্ডপে হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কির ফলে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে। সেই হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলির মাঝে পড়ে পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও অনেকে। উৎসবের মরসুমে চোরবাগান যেন বয়ে এনেছিল বিষাদের সুর! ওই ঘটনার পর থেকে নানা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবস্থাপনার অভাব, প্রবেশ-প্রস্থান পথ চওড়া না-হওয়া, পুলিশ-নিরাপত্তাকর্মীর অপ্রতুলতা, কোনও গাফিলতি যদি নজরে পড়ে থাকে— তার পরেও ছাড়পত্র দেওয়া, মণ্ডপে কম আলো— এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজাও। তার মধ্যে পুলিশ এবং রাজ্য সরকারের সিট তদন্ত করে সে দিনের ঘটনার ‘রহস্য’ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে।
এই ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই কলকাতা পুলিশ ছ’সদস্যের সিট গঠন করেছে। গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে ওই দল তদন্ত শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার সকালে তারা আবার এক বার চোরবাগানের ওই মণ্ডপে যায়। ঘুরে দেখে গোটা মণ্ডপ। আগেও এই দল চোরবাগানে গিয়েছিল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখার পাশাপাশি, শনিবার ওই সময়ে মণ্ডপে উপস্থিত সিভিক ভলান্টিয়ার থেকে শুরু করে ক্লাব সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্ঘটনার ঘটনাক্রম পুনর্নির্মাণ করেছিল সিট।
সিটের পর ফরেনসিক দলও ঘটনাস্থলে যায়। অতীতে ওই মণ্ডপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞেরা। বৃহস্পতিবার গোটা মণ্ডপ এবং আশপাশের অংশের ছবি থ্রিডি ক্যামেরায় তুলে নেন তাঁরা। ভবিষ্যতে ওই থ্রিডি স্ক্যানের ফুটেজ দেখে ঘটনাস্থল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। ফরেনসিক সূত্রে খবর, যদি ভবিষ্যতে ওই মণ্ডপ ভেঙে দেওয়া হয়, তবে তার আসল ছবিটা হারিয়ে যাবে। মণ্ডপ ভেঙে ফেলার আগে প্রয়োজনীয় যাবতীয় নমুনা সংগ্রহ করার প্রয়োজন, যা পরবর্তী কালে তদন্তে সাহায্য করবে। যদিও রাজ্যের গড়া সিটের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর জানান, প্রতিমা নিরঞ্জনে কোনও বাধা নেই। কিন্তু মণ্ডপ হুবহু একই থাকবে। তবে কত দিন ওই ভাবে মণ্ডপ থাকবে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। অনেকের ধারণা, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মণ্ডপ একই অবস্থায় রেখে দেওয়ার পক্ষে রাজ্য সরকারের সিটের। তিন মাসের মধ্যে সিট-কে চূড়ান্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে নবান্নের তরফে।
আরও পড়ুন:
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিট নাগাদ রাজ্য সরকারের গড়ে দেওয়া সিট চোরবাগানের মণ্ডপে যায়। ঘুরে দেখে মণ্ডপের ভিতরে এবং বাইরের অংশও। কোথায় কী আছে, প্রবেশ-প্রস্থান পথ কেমন, ঠিক কী ঘটেছিল— সেই সব খতিয়ে দেখে তারা। মণ্ডপের ভিডিয়োও করা হয়। ঘটনার সময় মণ্ডপ যেমন ছিল, এখনও ঠিক একই রকম আছে। প্রাক্তন বিচারপতি অনিন্দিতার সঙ্গে ছিলেন আইপিএস জাভেদ শামিম-সহ অন্যেরা। পরিদর্শন শেষে অনিন্দিতা বলেন, ‘‘আমরা সবটাই দেখলাম।’’ দুর্ঘটনার পর থেকেই অভিযোগ উঠছে, মণ্ডপে পর্যাপ্ত আলো ছিল না। সেই অভিযোগের মান্যতা দিল সিট-ও। তদন্তকারী দলের প্রধান বলেন, ‘‘সেই সময় যেমন আলো ছিল, সে ভাবেই রাখা হয়েছে। আলো খুবই কম ছিল।’’ শুধু তা-ই নয়, মণ্ডপে প্রবেশ এবং প্রস্থানের রাস্তা অত্যন্ত সরু বলেও জানান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। তিনি মনে করেন, ওই রাস্তায় এত লোক ঢুকে পড়ায় দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে!
চোরবাগানের পদপিষ্টের ঘটনায় কলকাতা পুলিশ এবং পুরসভার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিট জানিয়েছে, সকলেই তদন্তকারীদের আতশকাচের নীচে থাকবেন। কথা বলা হবে শিল্পীর সঙ্গেও। মণ্ডপে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে। অনিন্দিতা জানান, মণ্ডপের মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটেনি। ঘটেছে প্রস্থান গেটের ঠিক বাইরে। আর সেই সময় জরুরি প্রস্থান গেটেও তালা লাগানো ছিল বলেও তিনি জানতে পেরেছেন পুলিশের থেকে।
অভিযোগ উঠেছে, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেই মণ্ডপ থেকে কেউ বা কারা মাইকে ঘোষণা করেন, ‘‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে।’’ সেই ঘোষণায় সবাইকে দ্রুত মণ্ডপ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়। ওই ঘোষণায় আতঙ্কিত হয়ে আরও বেশি হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। ইতিমধ্যেই সন্দেহভাজন ঘোষকদের মধ্যে এক জন সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুকে নদিয়া থেকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি চোরবাগান পুজো কমিটির কোষাধ্যাক্ষও ছিলেন। বিপর্যয়ের পর থেকেই পলাতক ছিলেন তিনি। তাঁর বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হলেও পাত্তা পাওয়া যায়নি সেন্টুর। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে দু’জনকে চিহ্নিত করেছিল পুলিশ। তাঁদের মধ্যে সেন্টু ছিলেন। তাঁদের গতিবিধি উপর নজর রাখা হয়েছিল। তাঁদের খোঁজে বিভিন্ন দিকে অনুসন্ধানও চালানো হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার পর থেকেই সেন্টুর মোবাইল বন্ধ ছিল। গোপন আস্তানা থেকে বিভিন্ন সময়ে অন্য অন্য নম্বর থেকে পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন সেন্টু। তেমনই সন্দেহভাজন আটটি নম্বর ট্র্যাক করেন তদন্তকারীরা। আর সেই সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার নদিয়া থেকে সেন্টুকে পাকড়াও করে পুলিশ।
চোরবাগানের মণ্ডপের বাইরে যাওয়ার পথেই ছিল ক্লাব সদস্য এবং বিশেষ অতিথিদের বসার ঘর। সেখান থেকে মাইকে ঘোষণার ব্যবস্থাও ছিল। লালবাজার সূত্রে খবর, ঘোষক হিসেবে দু’জন অভিযুক্তের নাম উঠে এসেছে তদন্তে। তাঁদের মধ্যে গ্রেফতার সেন্টু। ওই সময়ে কেন তিনি মাইকে ওই ধরনের ঘোষণা করলেন? কারও নির্দেশ ছিল কি? এমন নানা প্রশ্নের উত্তর সেন্টুকে জেরা করে জানতে চান তদন্তকারীরা। সেই সঙ্গে অপর অভিযুক্তের খোঁজ চলছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু।
- বিপর্যয়ের পর প্রথমে পুজো কমিটির দু’জন কর্তা-সহ সাত জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে গ্রেফতার হন পুজোমণ্ডপের দুই ঘোষকও।
-
অন্য রোগীরাও কর্পোরেট হাসপাতালে যেতে চাইলে ‘প্রোটোকল’ কী হবে? চোরবাগান প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলল জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন
-
‘মাইকের ঘোষণা শোনা যায়নি’, দাবি চোরবাগানে আহতের, কোন পথে মৃত্যুমিছিলের তদন্ত
-
পুজোয় কলকাতায় থাকার কথাই ছিল না, এই প্রথম চোরবাগানের মণ্ডপে যান নিহত ঘোষ দম্পতি
-
মূল ঘোষক ছিলেন সেন্টু, কিন্তু ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ কে ঘোষণা করেন, কার নির্দেশে? কালিয়ার মুখোমুখি বসিয়ে হবে জেরা
-
‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’, ঘোষণা করে ‘বিপদ’ বাড়িয়েছিলেন! নদিয়া থেকে গ্রেফতার এক ঘোষক, এখনও অধরা আরও এক