Advertisement
E-Paper

অন্য রোগীরাও কর্পোরেট হাসপাতালে যেতে চাইলে ‘প্রোটোকল’ কী হবে? চোরবাগান প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলল জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন

দুর্গাপুজোর দ্বিতীয় সপ্তমীর দিন চোরবাগানের পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। পদপিষ্টের ঘটনায় জখমদের প্রাথমিক ভাবে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা হলেও পরবর্তী ক্ষেত্রে তাঁদের স্বভূমি সংলগ্ন বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৫১
হাসপাতালে আনা হচ্ছে আহতদের।

হাসপাতালে আনা হচ্ছে আহতদের। — নিজস্ব চিত্র।

চোরবাগানের দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে অন্য রোগীরাও কর্পোরেট হাসপাতালে যেতে চাইলে স্থানান্তরের ‘প্রোটোকল’ কী হবে? রবিবার সাংবাদিক বৈঠক করে এই প্রশ্ন তুলল আরজি কর আন্দোলনের সময় তৈরি ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্ট। গত ১৭ অক্টোবর রাতে মেডিক্যাল কলেজের ঘটনাক্রমের সূত্র ধরেই এ দিন এই প্রশ্ন তোলা হয়।

ডব্লিউবিজেডিএফের চিকিৎসক নেতা দেবাশিস হালদার বলেন, ‘‘আপৎকালীন পরিস্থিতিতে জখমদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। শুধু জানতে চাই, এর পর অন্য কোন‌ও দুর্ঘটনায় জখম ব্যক্তিরা এক‌ই রকম ভাবে বেসরকারি হাসপাতালের পরিষেবা নিতে চাইলে তার প্রোটোকল কী হবে? কোন কোন পরিস্থিতিতে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা যাবে, কোন কোন পরিস্থিতিতে যাবে না, তা জানিয়ে দেওয়া হোক!’’

দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। পদপিষ্টের ঘটনায় জখমদের প্রাথমিক ভাবে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা হলেও পরবর্তী ক্ষেত্রে তাঁদের স্বভূমি সংলগ্ন বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই স্থানান্তর নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাতে সাংবাদিক বৈঠক করেন মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্নেরা। সেই সকল জুনিয়র চিকিৎসকের প্রতিনিধি ইন্টার্ন সৌম্যদীপ দে বলেছিলেন, ‘‘সরকারি পরিকাঠামোয় একেবারে শীর্ষে মেডিক্যাল কলেজগুলির অবস্থান। সেই মেডিক্যাল কলেজ থেকে কী করে রোগীকে রেফার করা হয়? তা-ও আবার একটি কর্পোরেট হাসপাতালে!’’ এক‌ই সঙ্গে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার ওষুধ ট্রানিজ্যামিক‌ও নেই বলে অভিযোগ করেন সৌম্যদীপ। মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে তৈরি হ‌ওয়া বিতর্কের জল গড়িয়েছে স্বাস্থ্য ভবন পর্যন্ত। নবমীর দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে স্বাস্থ্য ভবনে জুনিয়র চিকিৎসকদের তোলা প্রশ্নের প্রেক্ষিতে জানান, জখমদের প্রাণ বাঁচানো ছিল সরকারের অগ্রাধিকার। সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোয় ত্রুটি যে আছে, তা একপ্রকার মেনে নিয়েই তিনি জানান, ১৯ জনের পর জখমদের মধ্যে যে একজনের‌ও মৃত্যু হয়নি এটা তাঁর সরকারের অন্যতম সাফল্য। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোকে ত্রুটি মুক্ত করতে আর‌ও বছর দুয়েক সময় প্রয়োজন। তবে এক‌ই সঙ্গে জুনিয়র চিকিৎসকেরা সঙ্কটজনক মুহূর্তে ওয়ার্ডে না থেকে সাংবাদিক বৈঠক করছিলেন কি না, তা দেখার জন্যও রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরকে নির্দেশ দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর সেই নির্দেশের পর রাজ্যের সবক’টি মেডিক্যাল কলেজের প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করে কড়া হ‌ওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।

ডব্লিউবিজেডিএফের দাবি, আসলে চোরবাগানের ‘অব্যবস্থা’ থেকে নজর ঘোরানোর জন্যই বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র চিকিৎসকেরা এই স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলায় এখন তাঁরা স্বাস্থ্য ভবনের রোষের শিকার হচ্ছেন। সেই জন্যই রিপোর্ট তলব করার পাশাপাশি অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের ‘কঠোর প্রশাসক’ হ‌ওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। শুক্রবারের যে‌ বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়ে ডব্লিউবিজেডিএফের সদস্যেরা সন্দিহান, সেই বৈঠকের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, জুনিয়র চিকিৎসকেরা যে সকল ওষুধ নেই বলে সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেছিলেন, তা ছিল বলেই প্রাথমিক রিপোর্টে স্বাস্থ্য দফতরকে জানিয়েছেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ। প্রসঙ্গত, চোরবাগানের বিপর্যয়ের রাতেই কেন জুনিয়র চিকিৎসকেরা এ ধরনের সাংবাদিক বৈঠক করেন, তা নিয়েও শাসক শিবিরের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট জুনিয়র চিকিৎসকদের নিশানা করা হয়েছে।

এই দুই প্রশ্নেই এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ডব্লিউবিজেডিএফ। জুনিয়র চিকিৎসকদের মঞ্চের তরফে চিকিৎসক পরিচয় পাণ্ডা জানান, এই সরকার আসার পর‌ও সরকারি হাসপাতালগুলিতে যে ন্যূনতম ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম পেতে অসুবিধা হচ্ছে, তা গত ২৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে জানানো হয়েছিল। পরিচয়ের দাবি, ‘‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, দরপত্র সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সমস্যা হচ্ছে। কোথায় কোথায় কী কী ওষুধ নেই তার একটা তালিকা তিনি করতে বলেছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আবার দেখা করে সেই তালিকা তুলে দেব।’’ জুনিয়র চিকিৎসকদের মঞ্চের অন্যতম সদস্য চিকিৎসক অগ্নিবীণ কুন্ডুর বক্তব্য, চোরবাগানের মতো ঘটনার মোকাবিলা করার জন্য এস‌এসকেএমে ডিজ়াস্টার ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্ড রয়েছে। সেখানে কুড়িটির বেশি শয্যা রয়েছে। এর আগেও দুর্ঘটনায় ওই ওয়ার্ডেই জখমদের চিকিৎসা হয়েছিল। তা হলে চোরবাগানের ক্ষেত্রে শুধু মেডিক্যাল কলেজ নয়, এস‌এসকেএমে চিকিৎসাধীন দু’জন রোগীকেও কেন বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হল?

এবিভিপির চিকিৎসক সংগঠন মেডিভিশনের আহ্বায়ক চিকিৎসক মানস বর্মন বলেন, ‘‘সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের অনেক জায়গায় ত্রুটি আছে, তা তো অস্বীকার করা হচ্ছে না। এত দিন তৃণমূল সরকার ছিল, এখন রাষ্ট্রবাদী সরকার‌ এসেছে। পরিবর্তনের হাত ধরে আসা রাষ্ট্রবাদী সরকার গত ১৫ বছরে নষ্ট হয়ে যাওয়া স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সংস্কার করে মানুষের প্রত্যাশা মেটানোর প্রশ্নে বদ্ধপরিকর। কিন্তু যাঁরা একটি নতুন সরকারকে সময় না দিয়ে শুধু খুঁত ধরতেই ব্যস্ত সেই বাম, অতি বাম মনোভাবাপন্ন চিকিৎসকেরা আসলে রাজনীতি ছাড়া কিছু বোঝেন‌ না।’’

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের টানাপড়েনের মধ্যে এ দিনের সাংবাদিক বৈঠক থেকে সরকারি হাসপাতালগুলিতে কোন কোন ওষুধ নেই, তার একটি তালিকা ডব্লিউবিজেডিএফের তরফে প্রকাশ করা হয়। ডব্লিউবিজেডিএফের বক্তব্য, প্রতিটি হাসপাতালে কোন কোন ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই তার একটি তালিকা টাঙানো থাকে। এদিন আরামবাগ মেডিক্যাল কলেজের গত ১৬ অক্টোবরের একটি নথি দেখিয়ে জুনিয়র চিকিৎসকদের তরফে দাবি করা হয় সেখানে বমির ইঞ্জেকশন মেটোক্লোপ্রোমাইড, স্ত্রীরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রোজেস্টেরন, পেটে ব্যথার ইঞ্জেকশন ডর্টিন পর্যন্ত নেই। গত শনিবার ন্যাশনাল মেডিক্যালের সার্জারি ওয়ার্ডে রক্ত তরল করার ইঞ্জেকশন এনোক্সাপারিন, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, সংক্রমণ রোধে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক পিপজো ছিল না। এক‌ই দিনে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে অমিল ছিল অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন পিপজো, অ্যামিকাসিন, খিঁচুনির ইঞ্জেকশন লিভেরা, রক্ত জমাট বাঁধানোর ইঞ্জেকশন ট্রানেক্সা, রক্ত তরল করার ইঞ্জেকশন হেপারিন, খিঁচুনি বন্ধ‌ করার ট্যাবলেট সোডিয়াম ভ্যালপ্রোয়েট, ব্যথার ওষুধ ট্রামাডল, পারকিনসনের ওষুধ সিন্ডোপা। এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে চোরবাগানের ঘটনার রাতে রক্তক্ষরণ বন্ধের ওষুধ ট্র্যানিজামিক যে ছিল না, সেই তথ্যও সামনে আনা হয়েছে। গত ১২ মে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এম‌এসভিপি ইন্দ্রনীল চট্টোপাধ্যায়কে লিখিত ভাবে ওষুধ , ইঞ্জেকশন, এবিজি মেশিন খারাপ থাকার কথা জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেছে ডব্লিউবিজেডিএফ।

ডব্লিউবিজেডিএফের সমালোচনার জবাবে আর‌এস‌এস প্রভাবিত চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল মেডিকোস অর্গানাইজেশনের সম্পাদক অর্ণপ পাল বলেন, ‘‘ডিউটি থাকাকালীন সাংবাদিক বৈঠক করেছে কি না, তার তো জবাব পেলাম না। ঘটনার দিন সাংবাদিক বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের প্রশ্ন ছিল, প্রশ্ন আছে। বিভ্রান্তি যদি কেউ তৈরি করার চেষ্টা করে তা হল বাম, অতি বাম মনোভাবাপন্ন এই জুনিয়র চিকিৎসকেরা। স্থানান্তরের পদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। যত দূর জানি, যে সকল বেসরকারি হাসপাতাল সরকারের কাছ থেকে সুযোগসুবিধা নিয়েছে, তাদের মোট শয্যার ১০ শতাংশ বেডে সরকারি হাসপাতালের রোগীরা যাতে পরিষেবা পান, তার জন্য ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য ভবনের তরফে একাধিক কার্যকরী বৈঠক করা হয়েছে। জীবনদায়ী ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি থাকলে পরিবর্তনের সরকার সে বিষয়েও কার্যকরী পদক্ষেপ করবে। আসলে যাঁরা আজ রোগীদরদি সাজার চেষ্টা করছেন তাঁদের আসল লক্ষ্য রাজনীতিই। সেই জন্যই বিপর্যয়ের রাতে ওই সাংবাদিক বৈঠক তাঁরা করেছিলেন। এখন চাপে পড়ে সাধু সাজার চেষ্টা করছেন।’’

ডব্লিউবিজেডিএফের সাংবাদিক বৈঠক প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ডব্লিউবিজেডিএফের কাছ থেকে আমি কোন‌ও তালিকা পাইনি। এখন‌ একটা মিটিংয়ে আছি। ওদের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে ‌জানাব।’’

সংক্ষেপে
  • চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু।
  • বিপর্যয়ের পর প্রথমে পুজো কমিটির দু’জন কর্তা-সহ সাত জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে গ্রেফতার হন পুজোমণ্ডপের দুই ঘোষকও।
Government hospitals Junior Doctors

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy