এক সপ্তাহ আগেও নদী ছিল বেশ কিছুটা দুরে। এক রাতেই তা চলে এল দোরগোড়ায়! চোখের নিমেষে পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে গেল আস্ত এক লোকালয়।
রঘুনাথগঞ্জ-২ ব্লকের তারানগর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাধাকৃষ্ণপুরে গত রবিবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকায়। নদী গ্রাস করেছে এলাকার একটি প্রাচীন মনসা মন্দির-সহ অন্তত ১৯টি বাড়ি। কেবল বসতভিটেই নয়, এক রাতের ভাঙনে জলের তোড়ে তলিয়ে গিয়েছে একাধিক চায়ের দোকান, মিষ্টির দোকান, সাইকেল মেরামতির দোকান এবং বিঘার পর বিঘা চাষের জমি। অন্তত ৫০ থেকে ৭০টি বাড়ি এখন ভাঙনের মুখে।
স্থানীয় সূত্রের খবর, গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকেই রাধাকৃষ্ণপুর এলাকায় পদ্মা নদীর পার ভাঙতে শুরু করেছিল। গত চার দিন ধরে ভাঙনের গতি কিছুটা কম থাকলেও রবিবার সন্ধ্যা হতেই আচমকা নদীর স্রোত মারাত্মক বৃদ্ধি পায়। নদীর পার হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়তে দেখে আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিজেদের ভিটেমাটি চোখের সামনে নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছাড়া শুরু হয়। বহু পরিবার তাঁদের সহায়-সম্বল হারিয়ে বর্তমানে খোলা আকাশের নীচে, রাস্তার ধারে, গাছতলায় এবং স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ও নিরাশ্রয় গ্রামবাসীদের অনেকেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। সর্বস্ব হারানো সুপ্রিয়া দাস কান্নাভেজা গলায় জানান, তাঁদের দু’টি ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, বারান্দা এবং সীমানা প্রাচীর—সব কিছুই নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। ঘর থেকে প্রায় কিছুই বার করা সম্ভব হয়নি। অন্য এক বাসিন্দা বাবুল দাসের অভিযোগ, চার দিন ধরে নদী ভাঙলেও প্রশাসন কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, ‘‘স্রেফ কিছু বালির বস্তা ফেলে দায় সারা হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি সাহায্য পাইনি।” অন্য দিকে, গ্রামবাসী প্রেমকুমার সিংহের দাবি, বালির বস্তা ফেলে এই তাণ্ডব রোখা সম্ভব নয়। অবিলম্বে বোল্ডার দিয়ে স্থায়ী বাঁধ না নির্মাণ করলে রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামটিই রাজ্যের মানচিত্র থেকে পুরোপুরি মুছে যাবে।
অতীতে ঘরহারানো কাশীনাথ দাসের অভিযোগ, গত বছর নদী ভাঙনে ঘর হারানোর পর প্রশাসন পাট্টার জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা এখনও ফাইলের জটিলতায় আটকে রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে সোমবার ঘটনাস্থলে পৌঁছোন জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার সুরেন্দর সিংহ, মহকুমাশাসক গদ্দাম সুধীরকুমার রেড্ডি, স্থানীয় বিডিও এবং সেচ দফতরের আধিকারিকেরা। এলাকা পরিদর্শনের পর পুলিশ সুপার জানান, রবিবার রাত থেকেই পুলিশি মাইকিংয়ের মাধ্যমে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ এলাকাগুলি থেকে বাসিন্দাদের চলে যেতে বলা হয়েছে। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে এলাকায় পুলিশ পিকেট বসানো হয়েছে। মহকুমাশাসক জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেচ ও ভাঙন প্রতিরোধ দফতরের সঙ্গে জরুরি বৈঠক সেরে দ্রুত বোল্ডার ও জিয়ো ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোখার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বাসিন্দাদের ভাঙনপ্রবণ এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে সমস্ত আশ্বাস সত্ত্বেও আতঙ্ক কাটছে না রাধাকৃষ্ণপুরে। পদ্মার গ্রাস থেকে মূল বসতি এলাকা এখন মাত্র ১০০ মিটার দূরে থাকায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে গোটা গ্রাম।