আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির ‘ভবিষ্যৎ’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। সেই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষে (সেনেট এবং হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টিটিভস) বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মার্কিন রাজনীতির অভিমুখ বদলের ফলে ভারতের কোনও লাভ হবে কি না, তা নিয়েও!
রাজনীতির কারবারিদের একাংশ মনে করছেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দীর্ঘ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে ভারতের অর্থনীতিতে। বিশেষ করে বাণিজ্য, রফতানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ডলার ও টাকার বিনিময়মূল্য এবং অপরিশোধিত তেলের দামের বেশ কিছু পরিবর্তন হতে পারে। ঘরোয়া রাজনীতিতে চাপের মুখে পড়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তির শর্ত আরোপের ক্ষেত্রে নমনীয় হতে পারে ট্রাম্প সরকার। যে কারণে সুবিধা পেতে পারে ভারত। পাশাপাশি, ভারতীয় পেশাদারদের কাজের সুযোগ বাড়তে পারে আমেরিকায়।
নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটন বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষিতে ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাণিজ্যনীতি ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে স্থিতিশীলতা। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ট্রাম্প সরকারের পক্ষে কর, ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতি কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। একতরফা ভাবে নতুন আইন পাস করানোও সম্ভব হবে না। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলানোয় ট্রাম্পের অভিবাসন বা শুল্কনীতি পুরোপুরি বদলে যাবে, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই অনেকের ধারণা। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একতরফা শুল্ক বৃদ্ধি ও বাণিজ্য যুদ্ধের যে নীতি ছিল, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ সম্ভব হবে। ফলে ট্রাম্প চাইলেই একতরফা ভাবে ‘রেসিপ্রোকাল ডিউটি’ (পারস্পরিক শুল্ক) চাপাতে পারবেন না।
২০২৫ সালে আমেরিকায় ভারতের পণ্য রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯,২৩০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮ লক্ষ ৭৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি)। যা দেশের মোট পণ্য রফতানির ২০.৭৫ শতাংশ। ফলে মার্কিন শুল্কনীতি বদলালে ভারতীয় রফতানিকারীদের উপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। শুল্ক সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমলে বস্ত্র, ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স-সহ ভারতের বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্র উপকৃত হতে পারে। পাশাপাশি, আমেরিকান সংস্থাগুলির প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ কর্মীদের চলাচল সহজ হলে তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা ক্ষেত্রে ভারতীয় পেশাদারদের সুযোগ বাড়তে পারে। বদলাতে পারে ট্রাম্পের জমানায় এইচ-১বি ভিসার আবেদনকারীদের জন্য বাড়তি অর্থ জমা দেওয়ার নীতি। সেই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফিরলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয় অর্থনীতিতে (ঘটনাচক্রে, ট্রাম্প নিজেও বুধবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয়ের জন্য ইরান যুদ্ধের অভিঘাতের কথা কবুল করেছেন)।
ট্রাম্পের আগ্রাসী বিদেশনীতি ও ইরান-সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ফলে তা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। পশ্চিম এশিয়া থেকে যুদ্ধের ‘ছায়া’ সরলে এবং হরমুজ় প্রণালী খুলে গেলে বিশ্বের বাণিজ্যক্ষেত্রে তার ইতিবাচক প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। পাশাপাশি, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হলে ভারতের আমদানি খরচ কমবে। যা টাকার অবমূল্যায়ন এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের সহায়ক হতে পারে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দু’বছরে ওয়াশিংটনের উপর ইসলামাবাদের (বিশেষত, পাক সেনা সর্বাধিনায়ক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের) প্রভাব লক্ষণীয় ভাবে বেড়েছে। সিঁদুর অভিযানের পরে ভারত-পাক সংঘর্ষবিরতিতে ‘ট্রাম্পের ভূমিকা’কে পাকিস্তান খোলাখুলি স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি, আমেরিকা-ইরানের সংঘাতের ইতি টানতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও নিতে দেখা গিয়েছে ইসলামাবাদকে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যা বদলে গেলে কূটনীতির ময়দানেও স্বস্তি মিলবে ভারতের।