প্রায় ৫০০ বছর ধরে ব্যবহৃত মার্কেটর প্রোজেকশনের বিকল্প হিসেবে আরও নির্ভুল মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে প্রস্তাব পাস করল রাষ্ট্রপুঞ্জ। শনিবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। তাতে ‘ইকুয়াল আর্থ’ নামে নতুন একটি মানচিত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দু’টি মানচিত্রের পার্থক্য কী? প্রথাগত ‘মার্কেটর মানচিত্রে’ মহাদেশগুলির তুলনামূলক আয়তনের ভারসাম্য লঙ্ঘিত হয় বলে অভিযোগ। তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে আফ্রিকায়। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি থাকা ভূখণ্ডগুলিকে বাস্তবের তুলনায় বড় দেখানোর ফলে ‘মার্কেটর মানচিত্রে’ গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় আফ্রিকার সমান আয়তনের মনে হয়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। অন্য দিকে, ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্রে মহাদেশগুলির তুলনামূলক আয়তন আরও নির্ভুল ভাবে দেখানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, ফ্লেমিশ (বর্তমান বেলজিয়াম)-জার্মান ভূগোল ও মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর ১৫৬৯ সালে ‘মার্কেটর মানচিত্র’ তৈরি করেছিলেন।
(বাঁ দিকে) ‘মার্কেটর মানচিত্র’ এবং ‘ইকুয়াল আর্থ’ (ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।
জেরার্ডাস তাঁর তৈরি মানচিত্রে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অঞ্চলের (মহাদেশ) আকৃতি ও কোণের সঠিক চিত্রায়নে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আপেক্ষিক আয়তনের ভারসাম্য পুরোপুরি ঠিক ছিল না। মূলত ত্রিমাত্রিক একটি গোলককে (যা পৃথিবীর আকৃতি) দ্বিমাত্রিক মানচিত্রে উপস্থাপনের ফলেই এমনটা ঘটেছিল। এর ফলে ‘মার্কেটর মানচিত্রে’ উত্তর গোলার্ধের অঞ্চলগুলি (মূলত আমেরিকা এবং ইউরোপ) প্রকৃত আয়তনের তুলনায় বড় দেখায়। বিষুবরেখাবর্তী অঞ্চলগুলিকে প্রকৃত আয়তনের তুলনায় ছোট দেখায়। ২০১৮ সালে এই বিকৃতি কমানোর লক্ষ্যে বোয়ান সাভরিচ, টম প্যাটারসন এবং বার্নহার্ড জেনি মিলে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রক্ষেপণ তৈরি করেন। এই প্রক্ষেপণে মহাদেশগুলির আপেক্ষিক ক্ষেত্রফল যথাসম্ভব সঠিক ভাবে তুলে ধরা হয়। সাভরিচ শনিবার বলেন, ‘‘আমাদের তৈরি ‘ইকুয়াল আর্থ’ মহাদেশগুলির আপেক্ষিক ভূপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল অক্ষুণ্ণ রাখে এবং একটি গোলকের উপর যেমন দেখা যায়, যতটা সম্ভব তেমনই তাদের আয়তন দেখায়।’’
আরও পড়ুন:
রাষ্ট্রপুঞ্জের মোট ১৭১টি সদস্যরাষ্ট্র শনিবার সাধারণ সভায় ভোটাভুটিতে অংশ নিয়েছিল তার মধ্যে ভারত-সহ ১৬৪টি দেশ ষোড়শ শতাব্দীর মার্কেটর প্রজেকশনের বদলে পৃথিবীর প্রকৃত আয়তন তুলনামূলক ভাবে সঠিক ভাবে দেখায়—এমন মানচিত্র, বিশেষ করে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রোজেকশন ব্যবহারে সমর্থন জানিয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম আমেরিকা! তারা প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ৬টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। মানচিত্র বদল সংক্রান্ত ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ নামের প্রস্তাবটি পেশ করেছিল আফ্রিকার দেশ টোগো। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও কূটনৈতিক সুসম্পর্কের মতো ‘প্রকৃত সমস্যা’ থেকে মনোযোগ সরাতেই মানচিত্র নিয়ে অনাবশ্যক বিতর্ক তৈরি করা তবে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় পাস হলেও সদস্যরাষ্ট্রগুলির জন্য ‘ইকুয়াল আর্থ’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়নি এই দফায়।