‘লক্ষ্মী মেয়ে’— এই কথাটার সঙ্গে আমরা ছোট থেকেই পরিচিত। কথা শুনলে সবাই ‘লক্ষ্মী মেয়ে’ বলবে, এই ভেবেই বাধ্য মেয়ের মতো থাকতাম আমি। দুর্গাপুজোটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেই তো লক্ষ্মীপুজো আসত। সেই সময় একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরত। আমি দু’-এক বার জিজ্ঞেসও করেছি মাকে, ‘‘এই তো লক্ষ্মী বাড়ি গেল, আবার কেন লক্ষ্মীপুজো?’’ তখন না বুঝে, নানা ধরনের প্রশ্ন করতাম। কিন্তু তার পরে আস্তে আস্তে বুঝেছি, লক্ষ্মীদেবী আসলে কে? ওঁর গুরুত্বটা আমাদের জীবনে কতটা।
বড় হয়ে আরও বেশি করে বুঝলাম। ওঁর কাছেই অবনত হন বহু ধনসম্পত্তির মালিকেরাও। ওঁকে পূজো করা হয়, যাতে সর্বক্ষণ ওঁর আশীর্বাদ আমাদের উপর থাকে। এবং অবশ্যই আমাদের পকেট যাতে শান্তিতে থাকার মতো ভরে থাকে। ওঁর আরাধনায় অদ্ভুত এক প্রশান্তি আছে। আর আমাদের বাড়িতে যেহেতু আমার ব্যবসা ছিল, তাই লক্ষ্মী-গণেশ একসঙ্গে পূজো করা হত। এটাই আমার বাড়ির নিয়ম দেখে আসছি।
আমাদের কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা হয়। সেই সময়টায় বাড়িতে প্রদীপ দিই, আর সারাবাড়ি আলপনা দিই আমি নিজে। আমাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে লক্ষ্মীর যে প্রভাব তা প্রতি বছর পুজোর সময় যেন নতুন করে বুঝতে পারি। মনে হয়, লক্ষ্মী থাকলে সব ঠিক থাকবে। নিজে উপার্জন করার পরেই এই উপলব্ধি হয়েছে আমার।
চাইব লক্ষ্মী যেন সকলের ঘরে বিরাজ করেন: ইশা। ছবি: সংগৃহীত।
আলাদা করে অনেক সময় বলা হয়ে থাকে, ‘লক্ষ্মী মেয়ে’। যে চুপচাপ, শান্ত, সবার কথা শুনে চলে, তাকে বলা হয় ‘লক্ষ্মীমন্ত’ মেয়ে। তাই লক্ষ্মীর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে আটকে থাকবে, ব্যাপারটা সে রকম নয়। স্বভাব-চরিত্রের দিক থেকেও ধরে নেওয়া হয়, যে শান্ত বা ভদ্র, সভ্য স্বভাবের, সে লক্ষ্মী ঠাকুরের মতো।
লক্ষ্মীর উদাহরণ যে ভাবে টানা হয়, সেটা থেকে একটা ধারণা বা ছাপ তৈরি হয়ে গিয়েছে, মানে লক্ষ্মীঠাকুর মানে এমনই দেখতে হবে, কেউ এমন স্বভাবেরই হবে। সমাজের চোখে তুমি যদি চুপচাপ থাকো তা হলে তোমাকে বলা হবে তুমি লক্ষ্মীঠাকুরের মতো। দেবতার বাইরেও খুব ভাল মানুষ লক্ষ্মী, এটুকু বুঝেছি। এমনই মানুষ আমাদের সমাজে এই মুহূর্তে খুব প্রয়োজন।
লক্ষ্মী-অলক্ষ্মীর মধ্যেও নানা টানাপড়েন চলে। অলক্ষ্মীর কোনও সংজ্ঞা কারও জানা নেই। কেউ যদি স্বাধীন ভাবে নিজের মত প্রকাশ করে, তা হলেই সমাজের কাছে সে অলক্ষ্মী হয়ে যায়। আমার একদমই মনে হয় না আমি লক্ষ্মী। পৃথিবীতে তোমাকে কেউ পছন্দ করে না, সেটা মুখে বলুক না-বলুক। যত তুমি কিউট থাকবে, যত তুমি মুখ বুজে সব সহ্য করবে, তত তুমি ভাল, তত তুমি লক্ষ্মী।
লক্ষ্মীপূজোর স্মৃতি মানে বাড়িতে আলপনা দেওয়া। আমাদের বাড়িতে লক্ষ্মীঠাকুরের ছবিতে পূজো হয়। সেই ফোটো সাজাতাম আমি। এটা আমার কাজ ছিল। সেটা খারাপ হোক, ভাল হোক, পুরোটাই আমার দায়িত্ব ছিল। চাঁদমালা দিয়ে সাজাতাম। সেগুলো আমি মিস করি। মা এখন আর অতটা করে উঠতে পারেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবার ব্যস্ততা বেড়েছে, আমিও থাকি না খুব একটা। এখন নাড়ু বানানো হয়, আর মা নারকেল আর দুধ দিয়ে ছাঁচে সন্দেশ তৈরি করে।
আমার কাছে লক্ষ্মী মানে ঘরে-বাইরে সমান ভাবে সামলানো। যাঁরা সমানতালে তা করে চলেছেন, এবং সবকিছুর মধ্যে নিজেকে ভাল রাখছেন, আশেপাশের সকলকেও ভাল রাখছেন, তাঁরাই আমার চোখে লক্ষ্মী। চাইব লক্ষ্মী যেন সকলের ঘরে বিরাজ করেন, দারিদ্র ঘুচিয়ে সকলের জীবনে নতুন আলো নিয়ে আসেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
- উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
- সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
-
শতবর্ষপ্রাচীন প্রতিমার পুজোর ভোগে ১০ রকমের খাবার! দেবাদৃতার ঘরোয়া লক্ষ্মীপুজো ঠিক কেমন হল
-
ঘরোয়া ভাবে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এ বার লক্ষ্মীপুজো শ্রীলেখার! দেবীর কাছে কোন বিশেষ প্রার্থনা করবেন তিনি?
-
‘মায়ের পছন্দ না হলে আমার হাত দিয়ে অন্য কিছু করান,’ অপরাজিতার বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় এ বার কী কী আয়োজন?
-
কেন জোড়া ইলিশ দেওয়া হয় লক্ষ্মীপুজোয়? তেল-মশলা ছাড়াই বানানো হয় ভোগপ্রসাদ, রন্ধনের নিয়মও আলাদা
-
লক্ষ্মীলাভে কেন পিছিয়ে বাংলা ছবি, কোন পথে আসবে সমৃদ্ধি? কী বলছেন প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেতারা