Advertisement
E-Paper

সহজ পাঠের উসরী, মহানায়কের ছবির শুটিং স্পট ঘুরে চলুন পরেশনাথ, সফরে থাক বৈচিত্র

পুজোর ছুটিতে সফরের জন্য ট্রেন, বাস, বিমানের টিকিট কাটা হয়নি? বেড়ানোর সঙ্গী হতে পারে চারচাকাই। আনন্দবাজার ডট কম-এ থাকছে সড়কপথে ভ্রমণের চেনা-অচেনা গন্তব্যের হদিস।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৩৩
Exploring Giridih, Usri Falls, Parasnath Hills & Uttam Kumar’s Shooting Locations

এই জলাধারই একসময় ছিল বাংলা ছবির জনপ্রিয় শুটিং স্পট। কী ভাবে যাবেন সেখানে? ছবি: সংগৃহীত।

পুজোর ছুটিতে ভিড় ঠেলে মণ্ডপে ঘুরতে ক্লান্ত লাগে? উত্তরবঙ্গেও পুজোর মরসুমে যানজটের ভোগান্তি থাকেই। এখনও পর্যন্ত বুঝতেই পারছেন না, কোথায় যাওয়া চলে? তা হলে গাড়ি নিয়ে চলুন পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার পরেশনাথে। গন্তব্য অবশ্য শুধু পাহাড় বা পাহাড়চূড়ার জৈন তীর্থক্ষেত্র নয়, ঘুরে নিতে পারবেন মাইথন, কল্যাণেশ্বরী, সহজ পাঠে পড়া উসরী নদী, উত্তমকুমারের ছবির শুটিংস্পটেও। দিন চারেকের ভ্রমণ হবে বৈচিত্রে মোড়া। গাড়ি চেপে যদি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, একটি দিন বনপথে ট্রেকও করতে পারেন।

কোনও এক সকালে গাড়ি নিয়ে দুগ্‌গা, দুগ্‌গা করে বেরিয়ে পড়ুন। ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গেলে কলকাতা থেকে পরেশনাথ পাহাড়ের দূরত্ব ৩২২ কিলোমিটার। তবে সরাসরি পরেশনাথ নয়, চলুন ঘুরতে ঘুরতে। প্রথম বার চা-বিরতির জন্য থামতে পারেন শক্তিগড়ে। ল্যাংচা, মিহিদিনাও চেখে নিতে পারেন। তার পরে গাড়ি ছুটুক পানাগড়, আসানসোল হয়ে মাইথনের দিকে। বরাকর নদীর উপর বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে জলাধার। আসানসোল শহর থেকে দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার। তবে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এটি পড়ে ঝাড়খণ্ডের ধানবাদে। শীতের দিনে মাইথনে চড়ুইভাতির আসর বসলেও, পুজোর সময় জলাধারে তুলনামূলক জল বেশি মিলবে। হাতে টানা নৌকোয় চেপে বা স্পিডবোটে করে জলাধারে একচক্কর দিয়ে সারাদিনের ক্লান্তি কাটিয়ে নিন।

মাইথন ব্যারেজ এবং জলাধার।

মাইথন ব্যারেজ এবং জলাধার। ছবি:সংগৃহীত।

তার পরে চলুন কল্যাণেশ্বরী মন্দির। মাইথন ব্যারাজ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে বরাকর নদীর পাড়ে তৈরি মন্দিরটি নিয়ে অনেক জনশ্রুতি রয়েছে। প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো মন্দির। তবে কল্যাণেশ্বরী মন্দির ঠিক কবে তৈরি হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনও পাথুরে প্রমাণ আজও মেলেনি। অনেকে মনে করেন, কাশীপুরের রাজা এই মন্দির স্থাপন করেছিলেন। জনশ্রুতি, কাশীপুরের এক রাজা বিবাহের যৌতুক হিসেবে দেবী কল্যাণেশ্বরীকে পান। এখানে পুজো দিতে গেলে লম্বা লাইন দিতে হতে পারে। চাইলে মন্দির দর্শন করেও চলে আসতে পারেন। মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিন মাইথনের কাছাকাছি কোথাও। এখানে একাধিক ভাতের হোটেল রয়েছে। খাবারও সুস্বাদু। খানিক জিরিয়ে চলুন ধানবাদের দিকে। মাইথন থেকে দূরত্ব মোটামুটি ৪৭ কিলোমিটার। রাস্তা ফাঁকা থাকলে দেড় ঘণ্টাতেই পৌঁছে যাবেন। দিনভর ঘোরাঘুরির ধকল দূর করতে কোনও একটি হোটেল রাতটি কাটিয়ে নিন। পরের দিন জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ুন তোপচাঁচি হ্রদ ঘুরতে। ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে এগোতে হবে। ধানবাদ শহর থেকে দূরত্ব ৩৬ কিলোমিটারের মতো। ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগবে বড়জোর।

মূল সড়ক ছেড়ে তোপচাঁচি হ্রদে যাওয়ার রাস্তাটি ভারি সুন্দর। দু’পাশ থেকে সবুজ গাছপালা যেন চাঁদোয়া তৈরি করেছে। চারদিক শুনশান। পাহাড়ঘেরা জলাধারের কাছেই একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। লোকমুখে শোনা যায়, একসময় শুটিং করতে এসে উত্তমকুমার এই বাড়িতে ছিলেন। এখন অবশ্য সেটি তালাবন্ধই থাকে। লোকে বলেন, উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবির শুটিং হয়েছিল এখানেই। জলাধারটি একসময় ছিল বাংলা সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় শুটিং স্পট। জায়গাটি নির্জন এবং মনোরমও। একসময় লোকজন তোপচাঁচি নিয়ে উৎসাহী হলেও, এখন এই জায়গা যেন আগেকার কৌলীন্য হারিয়েছে। ঠিক সেই কারণেই পুজোভ্রমণেও ভিড় ঠেলতে হবে না এই জায়গায় এলে।

তোপচাঁচি হ্রদে একসময় বাংলা সিনেমার শুটিং হয়েছে।

তোপচাঁচি হ্রদে একসময় বাংলা সিনেমার শুটিং হয়েছে। ছবি:সংগৃহীত।

তোপচাঁচি ঘুরে ৪৫ কিলোমিটার দূরে চলুন সহজ পাঠে পড়া উসরী ঝর্না দেখতে। সাহিত্যের পাতায় বার বার এসেছে উসরীর নাম। সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট চরিত্র প্রোফেসর শুঙ্কুও উসরী নদীর ধারে ঘুরতে যেতেন তিনি। উসরী জলধারা নেমে আসে টিলার বুকে দুই জায়গা দিয়ে। চারপাশে অজস্র পাথর ছড়ানো। সেই পাথরেও চোখ পড়ে জলের ক্ষয়কাজের অপূর্ব রূপ। ঘণ্টাখানেক দিব্যি এখানে কাটিয়ে দেওয়া যায়।

উসরী  ঝর্না।

উসরী ঝর্না। —নিজস্ব চিত্র।

এখান থেকে চিরকি-মধুবন রোড ধরে চলুন পরেশনাথ পাহাড়ের উদ্দেশে। যেতে বড়জোর ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগবে। পরেশনাথ পাহাড়ের চূড়ায় জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের স্মরণে তৈরি হয়েছে মন্দির। জৈন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এই স্থানেই পার্শ্বনাথ মোক্ষলাভ করেছিলেন। পাহাড়ের আনাচকানাচে অন্য জৈন তীর্থঙ্করদের নামাঙ্কিত ছোট ছোট মন্দির বা টোঙ্কও রয়েছে। আছে পাহাড়ি ঝোরাও।

পরেশনাথ পাহাড়ের পাদদেশ মধুবন। থাকার জায়গা মিলবে সেখানেই। মধুবন থেকে পার্শ্বনাথ মন্দির প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ। কোথাও চড়াই, কোথাও আবার বাঁধানো সিঁড়ি। চূড়া পর্যন্ত পৌঁছোতে গেলে ট্রেকিং করতে হয়। ইদানীং অবশ্য এই পথে বাইকচালকেরা অর্থমূল্যের বিনিময়ে পর্যটকদের পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে পার্শ্বনাথ মন্দিরে পৌঁছোনোর শেষ ধাপে রয়েছে অনেক সিঁড়ি। সেগুলি কিন্তু হেঁটেই উঠতে হয়।

পরেশনাথ পাহাড়ের মাথায় মন্দির।

পরেশনাথ পাহাড়ের মাথায় মন্দির। ছবি:সংগৃহীত।

একটু অন্যরকম ভ্রমণের শরিক হতে তৃতীয় দিন সকালবেলা পরেশনাথ পাহাড়ে চড়ার প্রস্তুতি নিতে পারেন। পাহাড়ে চড়ার জন্য লাঠি এবং আনুষঙ্গিক জিনিস মিলবে মধুবনে পাহাড়ের ঠিক নীচের অংশের গুমটিগুলি থেকে।

পাহাড়ে চড়া শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখে পড়বে মারাংবুরুর মন্দির। তিনি আদিবাসীদের দেবতা। তাঁর নামেই এই পাহাড়কে কেউ কেউ মারাংবুরু পাহাড়ও বলেন। জৈন ধর্মালম্বীরা বিশ্বাস করেন, ২০ জন জৈন তীর্থঙ্কর এই পাহাড় থেকে মোক্ষলাভ করেছিলেন। সে কারণে এই স্থান অতি পবিত্র। পাহাড়ি পথ সুন্দর করে বাঁধানো। স্থানে স্থানে চড়াই। রয়েছে সিঁড়ি। কোথাও আবার রাস্তা সংক্ষিপ্ত করার জন্য পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওঠার ব্যবস্থাও আছে।

পরেশনাথ পাহাড়ের মাথায় রয়েছে একাধিক টোঙ্ক বা মন্দির।

পরেশনাথ পাহাড়ের মাথায় রয়েছে একাধিক টোঙ্ক বা মন্দির। ছবি:সংগৃহীত।

তিরচিহ্ন দিয়ে দিকনির্দেশ করা রয়েছে প্রতি পদক্ষেপে। জৈন তীর্থঙ্করদের টোঙ্ক বা মন্দিরগুলি কোথায় রয়েছে, সেগুলি বুঝে নিতেও সে কারণে কোনও অসুবিধা হবে না। যাত্রাপথে মাঝেমধ্যেই মিলবে ছোট গুমটি। সেখানেই চা, খাবার পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও বিশ্রামের জন্য খাটিয়া ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

হেঁটে উঠতে হলে বিশ্রাম নিয়ে, টুকিটাকি শুকনো খাবার খেতে খেতে ধীরে চলাই ভাল। পথশ্রমে খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়লে ডুলি ভাড়া করা যায়। তবে বাইকে গেলে কষ্ট অনেকটাই কমে যায়। গোটা যাত্রাপথে যে যে জায়গায় সিঁড়ি আছে, সেই স্থানগুলি বাইকে গেলেও হেঁটেই উঠতে হয়। পাহাড়ের মাথায় পাথরে বাঁধানো মন্দিরচত্বর থেকে উপভোগ করা যায় আশপাশের সৌন্দর্য। ট্রেকিং করতে চাইলে একটি দিন পুরো রাখুন।

বিকেল বিকেল ফিরে বিশ্রাম নিন। চতুর্থ দিন প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়ুন কলকাতার উদ্দেশে। ফিরতে পথে দেখে নিতে পারেন নিতে পারেন ভটিন্ডা জলপ্রপাত। গোবিন্দপুর মোড় থেকে ১৫ কিলোমিটার ধানবা্দ শহর, সেখান থেকে আরও ১৬ কিলোমিটার দূরে ভটিন্ডা। গাছগাছালি ঘেরা স্থানে ধাপে ধাপে নেমে আসে জলস্রোত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর।

কোথায় থাকবেন?

ধানবাদে থাকার একাধিক হোটেল রয়েছে। বিভিন্ন মানের হোটেল মিলবে। মধুবনে ঝাঁ চকচকে রিসর্ট না মিললেও, থাকার বেশ কিছু স্থান রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন?

কলকাতা থেকে মাইথন যেতে ধরতে হবে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক, ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক, এইচ১। সেখান থেকে ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে চলুন গোবিন্দপুর মোড় হয়ে ধানবাদে। সেখান থেকে তোপচাঁচি হয়ে মধুবন যাওয়ার পথে ১৯ এবং ১১৪এ জাতীয় সড়ক ধরুন।

সংক্ষেপে
  • লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
  • উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
  • সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্‌সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
Durga Puja Travel Travel Tips Travel by Car

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy