মিথ্যা বলে ব্রিটেনে পড়াশোনার অজুহাতে শ্বশুরবাড়ির ৬৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মারধরও করতেন! সমাজমাধ্যমে স্বামীর বিরুদ্ধে তেমনটাই অভিযোগ তুলে সরব এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) তরুণী। ওই সিএ তরুণীর নাম গুঞ্জন রাঠোর। সুখী দাম্পত্যজীবনের সূচনা বলে যা মনে হয়েছিল, তা শীঘ্রই এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় তাঁর জীবনে। তিনি জানান, অনলাইন ঘটকালি সংস্থার মাধ্যমে পরিচিত হওয়া যে ব্যক্তিকে তিনি বিয়ে করেছিলেন, তিনি কেবল তাঁর পরিবারের কাছ থেকে প্রতারণা করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়েই নেননি, বরং তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতনও চালিয়েছিলেন। সেই সংক্রান্ত একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। ভাইরাল হয়েছে ভিডিয়োটি। যদিও সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই আনন্দবাজার ডট কম।
সমাজমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেওয়ার সময় গুঞ্জন জানিয়েছেন, সম্পর্কের শুরুর সময় কিছু বিষয়ে খটকা লেগেছিল তাঁর। কিন্তু বিয়ের পর পরিস্থিতি ভাল হবে, এমনটাই আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে নির্যাতন আরও বেড়ে যায় এবং তাঁকে শূন্য থেকে নিজের জীবন নতুন করে গড়ে তোলার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। গুঞ্জনের কথায়, দু’জনেই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ায় তিনি ভেবেছিলেন যে তাঁদের মধ্যে ভাল বোঝাপড়া হবে।
আরও পড়ুন:
গুঞ্জন বলেন, ‘‘২৬ বছর বয়সে আমি এক জন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসাবে দু’টি ব্যবসা চালাচ্ছিলাম। আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী ছিলাম এবং সংসার করার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম। ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটে যখন ওঁর (স্বামী) সঙ্গে পরিচয় হল তখন মনে হয়েছিল আমরা একে অপরের জন্য উপযুক্ত। কারণ উনি নিজেও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। কিন্তু তখন আমি বুঝতেই পারিনি যে আমি আসলে একটি প্রতারণা এবং অর্থ আদায়ের ফাঁদের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।’’
আরও পড়ুন:
তরুণী সিএ দাবি করেছেন, বিয়ের ঠিক এক মাস আগে থেকেই সমস্যার সূত্রপাত হয়। তাঁর অভিযোগ, স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজন তখন যৌতুকের দাবি তোলেন। তাঁরা একটি গাড়ি, নগদ ৫ লক্ষ টাকা এবং আত্মীয়স্বজনদের জন্য রুপোর কয়েন দাবি করেছিলেন। গুঞ্জনের কথায়, ‘‘আমি আমার অবস্থানে অনড় ছিলাম। গাড়ি ও নগদ টাকা দিতে অস্বীকার করি। তবে আত্মীয়দের জন্য রুপোর কয়েন আমরা দিয়েছিলাম। এত সব বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও আমাদের বিয়েটা হয় এই আশায় যে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।’’
গুঞ্জন জানিয়েছেন, বিয়ের কয়েক মাস পর তিনি এবং তাঁর স্বামী ব্রিটেনের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) করার জন্য আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন। দু’জনেই লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। গুঞ্জন জানান, জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরুর আশায় তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তাঁর দাবি, স্বামী জানিয়েছিলেন যে পরিবার তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং তাঁকে বিদেশে পাঠানোর টাকা দিতে রাজি নন। স্বামী তাঁকে নিজের নামে ৫০ লক্ষ টাকার শিক্ষা ঋণ নিতে বাধ্য করেন। এ ছাড়াও ভিসা-সংক্রান্ত খরচের কথা বলে তাঁর মায়ের থেকে আরও ১৩ লক্ষ টাকা দিতেও বাধ্য করেন স্বামী।
আরও পড়ুন:
গুঞ্জন বলেন, ‘‘স্বামী আমাকে নিজের নামে ৫০ লক্ষ টাকার শিক্ষা ঋণ নিতে রাজি করান এবং আমার মাকে কৌশলে ভিসা বাবদ ১৩ লাখ টাকা দিতে বাধ্য করেন। তিনি এমন ভান করেছিলেন যেন তাঁর বাবা তাঁকে আর্থিক ভাবে সহায়তা করছেন না এবং এ কারণে তিনি বাবার সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছেন। আমরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিলাম এবং পুরো খরচ বহন করেছিলাম।’’
তবে গুঞ্জন জানান, ব্রিটেনে পৌঁছোনোর মাত্র তিন দিন আগে তাঁর স্বামী হঠাৎ এক রাতে উধাও হয়ে যান। ফিরে আসার পর তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের পাসপোর্ট থেকে ভিসার পাতাটি ছিঁড়ে ফেলেন। ফলে বিদেশে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। গুঞ্জনের দাবি, তিনি হতবাক হয়ে গেলে তাঁর স্বামী স্বীকার করেন যে বিদেশে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না এবং তিনি আসলে টাকাগুলি আত্মসাৎ করতেই এমনটা করেছিলেন। তরুণী সিএ বলেন, ‘‘স্বামী আমাকে বলেছিলেন যে তিনি যাবেন না এবং সব টাকা নিজের কাছে রেখে দেন। এর ফলে আমার ৬৫ বছর বয়সি অবসরপ্রাপ্ত বাবাকে কান্নায় ভেঙে পড়তে হয়। ঋণের সুদ মেটাতে তাঁকে তাঁর সারা জীবনের জমানো অর্থ ভাঙাতে হয়েছিল।’’
আরও পড়ুন:
গুঞ্জন জানিয়েছেন, টাকা আত্মসাৎ করার পাশাপাশি তাঁর উপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন স্বামী। চড় মারতে এবং চুলের মুঠি ধরে টানতে শুরু করেন। স্বামী নাকি তাঁকে বলেছিলেন যে, ‘‘আমি তোমার বাবার টাকা মেরে দিয়েছি। পারলে তা ফেরত নিয়ে দেখাও।’’ তরুণী আরও অভিযোগ করেন যে, স্বামীর পরিবারের সদস্যেরাও তাঁর এই আচরণকে সমর্থন করতেন। ঋতুস্রাব চলাকালীন একবার স্বামী তাঁর পেটে ঘুষি মেরেছিলেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন গুঞ্জন।
গুঞ্জনের দাবি, ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় যখন তাঁর স্বামী স্বীকার করেন যে, কেবল শারীরিক চাহিদার কারণেই তিনি তাঁর সঙ্গে থাকছেন। তিনি বলেন, “আমি যখন তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করি, তখনই চূড়ান্ত মুহূর্তটি আসে। স্বামী সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন যে, কেবল শারীরিক প্রয়োজনেই তিনি আমার সঙ্গে আছেন। সে রাতেই আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসি। থানায় অভিযোগ দায়ের করি এবং স্বামীকে গ্রেফতার করাই।”
গুঞ্জন জানিয়েছেন, মাত্র কয়েক দিন কারাগারে থাকার পরই তাঁর স্বামীকে জামিন দেওয়া হয়। এখন আর তাঁদের সম্পর্ক নেই। তরুণীর দাবি, এখন তিনি নিজের জীবন নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য দিকে, তাঁর স্বামীর পরিবার ইতিমধ্যেই তাঁর জন্য বিয়ের নতুন পাত্রী খুঁজছে।
সমাজমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসা গুঞ্জনের ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই বহু মানুষ দেখেছেন। লাইক এবং কমেন্টের বন্যা বয়ে গিয়েছে। ভিডিয়োটি দেখার পর গুঞ্জনকে সমর্থন জানিয়েছেন নেটাগরিকেরা। তাঁর স্বামীর শাস্তির দাবিতেও সরব হয়েছেন নেটাগরিকদের একাংশ।