Advertisement
E-Paper

গাইঘাটা ধর্ষণ-খুন: গভীর রাতে অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যায় পুলিশ, ‘পালানোর চেষ্টা’ করতেই বুকে দুটো গুলি, পায়ে একটা

গত শনিবার গাইঘাটা থানা এলাকার বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরী বাড়ির কাছেই আয়োজিত একটি জলসা দেখতে গিয়েছিল। ফোন পেয়ে সে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তার পর আর ফেরেনি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ২২:২৬
নিহত প্রহ্লাদ দাস।

নিহত প্রহ্লাদ দাস। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আবারও এনকাউন্টার। এ বার উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায়। পুলিশের দাবি, ধর্ষণ ও খুনের মামলায় মূল অভিযুক্ত যুবককে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে গিয়েছিল তারা। সেই সময়ে পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। গুলিও ছোড়েন। আর তখনই পুলিশের পাল্টা ছোড়া গুলি লাগে অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসের বাঁ পায়ে এবং বুকে। মোট তিনটি। নিহতের মা জানিয়েছেন, নাগরিক হিসাবে তিনি ‘খুশি’। তবে ‘এনকাউন্টার’ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। বাবার বক্তব্য, পুলিশ ঠিক করেছে। গাইঘাটায় প্রতিবেশীর বাড়ির পিছন দিক থেকে গত রবিবার বিবস্ত্র অবস্থায় উদ্ধার হয় এক কিশোরীর ক্ষতবিক্ষত দেহ। পরিবারের অভিযোগ, তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। ঘটনায় রবিবারই ওই পরিবারের আত্মীয় প্রহ্লাদকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।

সোমবার রাত। ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রহ্লাদকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে তাঁর গাইঘাটার বাড়িতে গিয়েছিল পুলিশ। বাবা-মায়ের সঙ্গে ছেলের দেখা করিয়ে দেয় তারা। তাঁদের হাতে তুলে দেয় প্রহ্লাদের জামা-প্যান্ট, যা আগে পরেছিলেন। প্রহ্লাদের মা বলেন, ‘‘যে জামা-প্যান্ট আগে পরেছিল, সেগুলো আমাদের হাতে দিল পুলিশ। আমি কোনও কথা বলিনি।’’ মৃতের ভাই ধ্রব দাস বলেন, ‘‘রাত ২টোর সময় (আবার) এসেছিলেন স্যারেরা। এসে বাবা-মাকে বললেন, আপনাদের যেতে হবে। তখনও ওঁরা কেউ বলেননি যে এনকাউন্টার হয়েছে। আমি ভাবতে পারিনি দাদা এমন কাজ করতে পারে।’’

মাঝে কী ঘটেছিল?

পুলিশ সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, সোমবার রাত ১২টার কিছু আগে অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য যাওয়া হয়। অকুস্থল থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরেই বাংলাদেশ সীমান্ত। পুলিশের ওই সূত্রের দাবি, রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণ পর্ব শেষে ফেরার সময়ে পুলিশকর্মীদের উপর হামলা করেন অভিযুক্ত। গাড়িতে করে যখন অভিযুক্তকে নিয়ে ফেরা হচ্ছিল, তখন বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে তিনি প্রস্রাব করার জন্য গাড়ি থামাতে অনুরোধ করেন। তার পরেই তিনি কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নেন বলে দাবি পুলিশের। পুলিশের ওই সূত্রের বক্তব্য, পর পর তিন রাউন্ড গুলি চালান অভিযুক্ত। তার মধ্যে একটি গুলি লাগে পুলিশের গাড়িতে।

পুলিশের ওই সূত্রের দাবি, প্রাথমিক ভাবে ঘটনার আকস্মিকতায় প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন পুলিশকর্মীরা। সে সময় এক পুলিশকর্মী জখম হন। এক জন রাস্তার ধারের জলাশয়ে ঝাঁপ দেন। তার পরে আত্মরক্ষার জন্য চার রাউন্ড গুলি চালায় পুলিশও। পুলিশের ছোড়া পাল্টা গুলি লাগে প্রহ্লাদের বাঁ পায়ে এবং বুকে। মোট তিনটি। চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। চিকিৎসকেরা প্রহ্লাদকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের মা বলেন, ‘‘আমার ছেলেকে তো পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ওর কঠোর শাস্তি হোক চেয়েছিলাম। কিন্তু এনকাউন্টার চাইনি। বলল পালাচ্ছিল। এত গার্ড থাকতে কী ভাবে পালাচ্ছিল ও। পালাচ্ছিল নাকি! গুলি করেছে... যাক।’’

কিশোরীর পরিবারের বক্তব্য

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় ‘এনকাউন্টারের’ ঘটনায় পুলিশকেই সমর্থন করছে নিহত কিশোরীর পরিবার। মঙ্গলবার কিশোরীর বাবা এই প্রসঙ্গে বলেন, “শুনেছি পুলিশের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা করছিল। তাই পুলিশই গুলি করছে। পালানোর চেষ্টা করলে গুলি তো করবেই। তবে আমার মেয়েকে কি আর ফিরে পাব?” নিহত কিশোরীর মা বলেন, “অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করছিল। গুলি চালিয়েছিল। শুনেছি মারা গিয়েছে। ভালই হয়েছে।” কিশোরীর পরিবারের আর এক সদস্য এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, “অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করছিল। পুলিশের উপরেই গুলি চালানোর চেষ্টা করে। শুনেছি এনকাউন্টারে মারা গিয়েছে। তার জন্য পুলিশ-প্রশাসনের কাছে কৃতজ্ঞ। এটা বুঝলাম যে, উপরে ভগবান আছেন। আমরা সঠিক বিচার পেয়েছি।”

অভিযুক্তের পরিবারের বক্তব্য

পুলিশের ‘এনকাউন্টারে’ নিহত পুত্রের দেহ রাখা হাসপাতালে। বাইরে সকাল থেকে বসেছিলেন বাবা-মা। পাশে ঘিরেছিলেন পুলিশকর্মীরা। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার খানিক পরে গাইঘাটার চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতাল হঠাৎ হইচই। এনকাউন্টারে নিহতের দেহ বার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা মা ঝট করে উঠে দাঁড়ান। সামনে পুত্রের দেহ দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। চিৎকার করে বলতে থাকলেন, ‘‘আমার কথা একবারও ভাবলি না! এ কী অন্যায় করলি বাবা...।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার শিক্ষিত ছেলে... অন্যায় করেছে। শাস্তি পেল। পুলিশকেও বলেছি।’’ তাঁর কথায়, ‘‘আমার ছেলেকে তো পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ওর কঠোর শাস্তি হোক চেয়েছিলাম। কিন্তু এনকাউন্টার চাইনি। বলল পালাচ্ছিল। এত গার্ড থাকতে কী ভাবে পালাচ্ছিল ও। পালাচ্ছিল নাকি! গুলি করেছে... যাক।’’ খানিক বাদে সদ্য সন্তানহারা মায়ের মন্তব্য, ‘‘মা হিসেবে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে খুশি। আমার মেয়ের সঙ্গে এমন হলে তখন তো আমি শাস্তিই চাইতাম। আশা করব, আর কেউ যেন ঘৃণ্য কাজ না করে। ওর মতো কাউকে চলে যেতে না হয়।’’ বাবাও বলেন, ‘‘আমি খুব খুশি। যা হয়েছে, ঠিক হয়েছে।’’

নিহতের ভাইয়ের বক্তব্য

গাইঘাটার ‘নির্যাতিতা’ এবং ‘এনকাউন্টারে’ নিহত অভিযুক্ত, পূর্বপরিচিত এবং দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও। পরস্পরকে তাঁরা খুব ভাল ভাবে চিনতেন। তাঁদের ঘনিষ্ঠতাও ছিল বলে দাবি নিহত প্রহ্লাদ দাসের ভাই ধ্রুব দাসের। ওই তরুণ জানান, তাঁর দাদার দোকানে মাঝেসাঝে যেত একাদশ শ্রেণির ছাত্রীটি। দু’জনের প্রায়শই ঝগড়া হত। বাড়িতেও সে কথা বলেছিলেন দাদা। এখন দাদা পুলিশকে গুলি করে পালাতে চেয়েছিলেন শুনে আরও বিস্মিত বছর কুড়ির ওই তরুণ বলেন, ‘‘আমি ভাবতে পারছি না...!’’ ধ্রুবের কথায়, ‘‘রাত ২টোর সময় এসেছিলেন স্যারেরা। এসে বাবা-মাকে বললেন, আপনাদের যেতে হবে। তখনও ওঁরা কেউ বলেননি যে এনকাউন্টার হয়েছে। আমি ভাবতে পারিনি দাদা এমন কাজ করতে পারে।’’

রাখঢাক নেই দিলীপের

পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ চাইলে সব কিছু করতে পারে— বলেছিলেন বারুইপুরের ‘এনকাউন্টারের’ পরে। তার সাড়ে তিন মাস পরে গাইঘাটার ‘এনকাউন্টারের’ পরেও একই মেজাজে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, অপরাধদমনের ক্ষেত্রে রাজ্যের নতুন সরকার ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতিতে চলছে। দৃষ্টান্ত স্থাপনের বার্তা দিয়ে বললেন, মানুষের মনে ভরসা ফেরাতে হলে পুলিশকে কিছু ‘অপ্রিয় কাজ’ করতে হবে। তাঁর কথায়, “এর আগেও ঘটনা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। খুনি পালাচ্ছিল। এনকাউন্টার হয়েছে। এখানেও (গাইঘাটাতেও) হয়েছে।” এর পরেই মন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে তাঁকে এমন পরিণতির জন্যই তৈরি থাকতে হবে। দিলীপ বলেন, “বিচারের সামনে সবাইকে আনতে হবে। আইনের উপরে কেউ নেই। কিন্তু কেউ যদি আইনকে অমান্য করে, তার সঙ্গে এ রকমই হবে।”

বিধায়ক রত্নার বক্তব্য

বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ রাখঢাক না করে জানিয়ে দিলেন তিনি ‘এনকাউন্টারে’র পক্ষে। আরজি কর-কাণ্ডে তাঁর মেয়ের ধর্ষণ-খুনে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে তিনি খুশি হতেন। রত্নার দাবি, এর ফলে অপরাধীদের মনে ভয় আসবে। এমন ঘটনার সংখ্যা কমবে। বিধায়কের কথায়, ‘‘আমার মেয়ের মতো ঘটনা... ‘এনকাউন্টার’ হয়েছে। ছেলেটির মায়ের হয়তো কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তিনি ছেলেকে ঠিক করে মানুষ করতে পারেননি।’’ বিধায়কের সংযোজন, ‘‘যারা মেয়েদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখে, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। এই ‘এনকাউন্টার’ আমি সমর্থন করি। যারা এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে, তারা একটু হলেও ভয় পাবে এতে।’’

ঘটনা

গত শনিবার গাইঘাটা থানা এলাকার বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরী বাড়ির কাছেই আয়োজিত একটি জলসা দেখতে গিয়েছিল। তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারের সদস্যেরাও ছিলেন সেখানে। জলসা অনেক রাত পর্যন্ত চলে। তার পরিবারের দাবি, রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ কিশোরীর কাছে একটি ফোন এসেছিল। ফোন পেয়ে সে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তার পর আর ফেরেনি। রাতে তাকে খুঁজে না পেয়ে চিন্তায় ছিল পরিবার। প্রায় সারা রাত খোঁজাখুঁজি চলে। শেষে রবিবার সকালে উদ্ধার হয়েছিল কিশোরীর বিবস্ত্র ক্ষতবিক্ষত দেহ। পরিবারের দাবি, তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। ঘটনায় রবিবারই ওই পরিবারের আত্মীয় প্রহ্লাদকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy