চোরবাগানে সপ্তমীর সন্ধ্যায় যে ঘটনা ঘটল, তার দায় কার? সেই নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। স্থানীয়দের একাংশ আঙুল তুলেছে পুলিশের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তা মানেননি। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী এবং আহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, পুলিশ সাহায্য করেছে। তিনি আঙুল তুলেছেন অস্থায়ী হোমগার্ডদের দিকেই, যাঁরা এই নিয়ে তিন বছর পুজোর কাজে রয়েছেন। পূর্বতন সরকারকে খোঁচা দিয়ে জানিয়েছেন, অনেক ‘আবর্জনা’ বয়ে চলেছেন। অস্থায়ী হোমগার্ডদের তালিকাও চেয়ে পাঠিয়েছেন তিনি। পুজোর মণ্ডপগুলিতে কোনও ত্রুটি রয়েছে কি না, তা পরীক্ষার জন্য এ বার যাবে বিশেষ দল। তারা সেখানে দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবে। তার জন্য কলকাতা পুলিশের কমিশনারকে সুপারিশ করতে হবে না। সে কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
চোরবাগানের বিপর্যয়ে প্রাণ গিয়েছে ১৯ জনের। রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রবিবার সকালে সাত জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির কয়েক জন কর্তাও। ভিআইপি পাস সামলানো এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাঁদের উপরে ছিল, তাঁদেরও পাকড়াও করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার দুই কর্মীও। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ ছিল, ঘটনার পরে পুলিশকে ডেকে পাওয়া যায়নি। তাঁরাই আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। এই নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘‘আমি কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা বলেন পুলিশই অ্যাপ ক্যাব ভাড়া করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।’’
তার পরেই মুখ্যমন্ত্রী আঙুল তোলেন অস্থায়ী হোমগার্ডদের দিকে। তাঁর কথায়, ‘‘মূল অভিযোগ অস্থায়ী হোমগার্ডডের বিরুদ্ধে। আগে ২ বছর ডিউটি করছে। এ বার তৃতীয় বছর। পুরো তালিকা চেয়ে পাঠিয়েছি।’’ তিনি কেন এ কথা বলছেন, তা-ও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘কাল রাতে ঘটনাস্থল গিয়েছি। ঘটনা ভিতরে হয়নি। যা মনে হল, প্রবেশ এবং প্রস্থানপথ এক, সেটা ভাগাভাগি করা হয় দড়ি দিয়ে। বৃষ্টি নামায় হোমগার্ডেরা দড়ি ফেলে পালায়।’’ মুখ্যমন্ত্রী এ-ও জানিয়েছেন, এক হোমগার্ডের সঙ্গে শনিবার তাঁর কথা হয়েছে, যিনি বাংলায় থেকেও বাংলা বলতে পারেন না। তাঁর কটাক্ষ, ‘‘ওরা কারা? অনেক গারবেজ নিয়ে চলছি।’’
এই বিপর্যয়ের পরে রবিবার সকালে ভবানী ভবনে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেন শুভেন্দু। সেখান থেকে বেরিয়েই তিনি জানান, চোরবাগানকাণ্ডের পরে রাজ্য কী ব্যবস্থা নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০ এবং ২১ অক্টোবর মৃত ১৮ জনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করবেন তিনি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য তুলে দেবেন তিনি। ময়নাতদন্তের পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডিএসপি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা দেহ নিয়ে গিয়ে পরিবারের হাতে তুলে দেবেন। শেষকৃত্য পর্যন্ত তাঁরা উপস্থিত থাকবেন। পরিবারের কেউ শোকে অসুস্থ হলে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মণ্ডপে কোনও ত্রুটি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে দল গঠন করা হয়েছে। বিপর্যয় মোকবিলা দফতরের প্রিন্সিপাল সচিব, ডিজি ফায়ার, ডিজিএসটিএফের নেতৃত্বে সেই দল কলকাতার পুজোয় পুজোয় ঘুরবে। ত্রুটি যা দেখবে, তা নিয়ে পদক্ষেপ করার জন্য বিভাগীয় ডিসি এবং স্থানীয় থানার ওসি-কে নির্দেশ দেবে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দকে সুপারিশ পাঠাতে হবে না। ওই দলের সদস্যেরাই মণ্ডপে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। ভিড় নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেবেন। মণ্ডপে কোনও ভিআইপি লাইন থাকবে না।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি নিজে লালবাজারে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমে যাবেন। শহরের পথের কী অবস্থা, তা দেখবেন। তাঁর কথায়, ‘‘শহরের অবস্থা চোখ দিয়ে দেখা উচিত। কান দিয়ে নয়।’’ শুভেন্দু মেনে নিয়েছেন যে, কমিটির ত্রুটি রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘আয়োজকদের ত্রুটি আছে। লোকাল পুলিশেরও দেখা উচিত ছিল। সে জন্য ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং দল হচ্ছে। যারা লাইসেন্স দিয়েছে, সেই পুরসভা, পুলিশ, দমকলকে দল থেকে বাদ রাখব। কর্তব্যরত বিচারপতির নেতৃত্বে সেই তথ্য অনুসন্ধানকারী দল করতে চাই।’’
শুভেন্দু জানিয়েছেন, এই বিষয়ে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগেকে চিঠি দিয়েছেন মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল। কর্তব্যরত বিচারপতি না পেলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে দিয়েই করতে হবে। স্বরাষ্ট্র দফতরের ন্যূনতম যুগ্মসচিব পদমর্যাদার আধিকারিক থাকবেন দলে। ডিজিপির প্রতিনিধি হিসেবে এডিজি থাকবেন। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর প্রিন্সিপাল সচিব থাকবেন অনুসন্ধানকারী দলে।
আরও পড়ুন:
-
মৃত্যুতেও ছাড়েনি হাত! ঠাকুর দেখতে এসে চোরবাগানের মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু নিউ টাউনের দুই বান্ধবীর
-
‘এরা বলছে পুজো কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের গাফিলতি রয়েছে’! মৃতদের পরিবারের অভিযোগ শুনে বললেন পদ্ম বিধায়ক রত্না
-
মর্গের সামনে গাড়ির পর গাড়ি, কান্না চেপে রেখে দায়িত্ব পালন! ‘বডি’ হয়ে যাওয়া প্রিয়জনেদের নিয়ে যেতে হবে শেষকৃত্যস্থলে
পুজো কমিটির যে পোস্টার প্রকাশ্যে এসেছে তাতে দেখা যায়, চোরবাগানের এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দেবদীপ অধিকারী। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো। জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা এই পুজো কমিটির চেয়ারম্যান। উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষও জড়িত রয়েছেন চোরবাগানের এই পুজোর সঙ্গে। তবে তাঁদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কি না, পুলিশের তরফে এখনও কিছু জানানো হয়নি। সেই নিয়ে ইতিমধ্যে সরব হয়েছে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আঙুল তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপোর দিকে। এই আবহে তথ্য অনুসন্ধানকারী দল গঠনের কথা জানালেন শুভেন্দু।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২৬ অক্টোবর আড়ম্বরহীন ভাবে বিজয়া সম্মিলনী হবে মিলন মেলায়। সেখানে কলকাতা ও পাঁচটি কমিশনারেটের পুজো উদ্যোক্তাদের ডাকা হবে। চোরবাগানে আহত ২৫ জন থাকবেন। তাদের হাতে ৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। তাঁর কথায়, ‘‘সেখানেই বলব, পরের বছরের পুজোর ব্যবস্থা এমন ভাবে হোক, যাতে ত্রুটি না থাকে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু।
- বিপর্যয়ের পর প্রথমে পুজো কমিটির দু’জন কর্তা-সহ সাত জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে গ্রেফতার হন পুজোমণ্ডপের দুই ঘোষকও।
-
অন্য রোগীরাও কর্পোরেট হাসপাতালে যেতে চাইলে ‘প্রোটোকল’ কী হবে? চোরবাগান প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলল জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন
-
‘মাইকের ঘোষণা শোনা যায়নি’, দাবি চোরবাগানে আহতের, কোন পথে মৃত্যুমিছিলের তদন্ত
-
পুজোয় কলকাতায় থাকার কথাই ছিল না, এই প্রথম চোরবাগানের মণ্ডপে যান নিহত ঘোষ দম্পতি
-
মূল ঘোষক ছিলেন সেন্টু, কিন্তু ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ কে ঘোষণা করেন, কার নির্দেশে? কালিয়ার মুখোমুখি বসিয়ে হবে জেরা
-
‘ঘোষক’ গ্রেফতার, থ্রিডি স্ক্যান করল ফরেনসিক! চোরবাগানে মণ্ডপ ঘুরে রাজ্যের গড়া ‘সিট’ জানাল, নজরে পুলিশ-পুরসভাও