আরজি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসক-পড়ুয়াকে ধর্ষণ ও খুন এবং দুর্নীতির ঘটনার সত্য উদ্ঘাটনে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের গঠন করা কমিটির প্রথম বৈঠক হল বৃহস্পতিবার। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শুভ্রকমল মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই কমিটিতে রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা দেবাশিস ভট্টাচার্য, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তাপস বসু, জগদ্দলের বিজেপি বিধায়ক রাজেশ কুমার, উত্তরপাড়ার বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী।
তদন্ত সংক্রান্ত বিষয়ে অভিজ্ঞতার জন্য দুই বিজেপি বিধায়ককে কমিটিতে রাখা হয়েছে বলে মত স্বাস্থ্যভবনের। রাজেশ অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস এবং দীপাঞ্জন কমান্ডো বাহিনী এনএসজির প্রাক্তন সদস্য। আরজি কর হাসপাতালে সন্দীপ ঘোষের আমলে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, চিকিৎসক তরুণীর মৃত্যুতে তার কোনও যোগসূত্র ছিল কি না, সে বিষয়ে এই কমিটি অনুসন্ধান করবে বলে খবর। গত ২৯ অগস্ট স্বাস্থ্য-শিক্ষা দফতরের অধিকর্তা এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলেন।
রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘অভয়ার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনা বাংলার মানুষকে গভীর ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আনার লক্ষ্যে একটা স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভয়ার পরিবার এবং সমগ্র চিকিৎসক সমাজের পাশে আমরা রয়েছি। কোনও আপস ছাড়া দ্রুত ন্যায়বিচার হবে। নিরপেক্ষ বিচার হবে।’’ প্রসঙ্গত, গত ৯ অগস্ট আরজি করের চিকিৎসক-পড়ুয়ার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটির লোকসংস্কৃতি ভবনে। মৃতার মা-বাবা ছাড়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ওই স্মরণসভায় আরজি করের তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে শুভেন্দু জানিয়েছিলেন, বিশেষ কমিটি গঠন করে ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার নতুন একটি মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করবেন। তার আগে ৮ অগস্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে পৃথক তদন্ত করা হবে তাঁর দফতরের তরফে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সে দিন ঘোষণা করছিলেন, ওই ঘটনার তদন্ত করবেন স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকেরা। তদন্ত শেষে যা উঠে আসবে, তা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে জানানো হবে। নির্যাতিতার শিক্ষকদের কথাও শুনবেন স্বাস্থ্য আধিকারিকেরা। হাসপাতালের পরিকাঠামোয় কী কী ফাঁক ছিল, পরে কী ভাবে সেই ফাঁক পূরণ করা হল, তা-ও দেখা হবে তদন্তে। প্রসঙ্গত, আরজি কর-কাণ্ডের তদন্ত প্রথম শুরু করেছিল কলকাতা পুলিশ। তারাই মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে (বর্তমানে দোষী সাব্যস্ত এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত) গ্রেফতার করে। পরে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে ওই মামলার তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। তারা চার্জশিটে সঞ্জয়কেই একমাত্র অভিযুক্ত বলে উল্লেখ করে এবং শিয়ালদহ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে আজীবন কারাবাসের নির্দেশ দেয়।
আরও পড়ুন:
যদিও সিবিআই বা পুলিশের তদন্তে প্রথম থেকেই অসন্তুষ্ট ছিল নির্যাতিতার পরিবার। তারা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় এবং আদালত কেন্দ্রীয় সংস্থাকে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী নতুন বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছিল সিবিআই। গত ৬ অগস্ট হাই কোর্টে রিপোর্ট জমা দিয়েছিল সিট। তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চ। সিবিআইয়ের তদন্ত সঠিক পথে এগোচ্ছে না বলেও জানিয়েছিল হাই কোর্ট। আদালতের বক্তব্য ছিল, পুরনো তদন্তের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে নতুন তদন্তকারী দলটিও।
২০২৪ সালের ৮ অগস্ট রাতে আরজি কর হাসপাতালে কয়েক জন সহকর্মীর সঙ্গে নির্যাতিতা রাতের খাবার খান। পরিবারের অভিযোগ, খাওয়ার সময় নির্যাতিতার সঙ্গে চার জন জুনিয়র ডাক্তার ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের যোগাযোগ ছিল। ওই চার জনকেই গ্রেফতার করে জেরার দাবি জানিয়েছে নির্যাতিতার পরিবার। জুনিয়র ডাক্তার সৌমিত্র রায়ের নাম করেন নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী। দাবি, নির্যাতিতার সঙ্গে এই সৌমিত্র নৈশভোজ সেরেছিলেন। কিন্তু তাঁর বয়ানই রেকর্ড করা হয়নি। ৬ অগস্ট হাই কোর্টে নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী বলেছিলেন, ‘‘ঘটনার আগে কী হয়েছিল, তা তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না। ওই দিন নির্যাতিতার সঙ্গে নৈশভোজে চার জন ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে সন্দীপ ঘোষের যোগ ছিল কি না, তদন্তে সেটা পাওয়া যাচ্ছে না? কেন তাঁদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না?’’