Advertisement
E-Paper

দিল্লিতে প্রতিবাদের নামে দিনের পর দিন জায়গা দখল নয়, স্পষ্ট বার্তা সুপ্রিম কোর্টের, ব্যবসায়ী সংগঠন এ বার পুলিশের দ্বারস্থ

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে দিল্লির ব্যবসায়ীরা বিরোধীদের সমাবেশে বিপুল জনসমাগমের কথা জানালেও তা মানতে নারাজ ডবল ইঞ্জিন সরকার ও শাসকদল। রামলীলা কর্মসূচিকে ‘ফ্লপ শো’ বলে কটাক্ষ করেছে তারা।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ২২:৪৭

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রামলীলা ময়দানে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ‘ইন্ডিয়া’র ডাকে রবিবারের সভা ঘিরে এখনও চাপানউতর অব্যাহত। রাজনীতির ময়দানের পাশাপাশি আদালতের আঙিনাতেও! মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, এসআইআর প্রক্রিয়া রদ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ ও রক্ষাকবচ দেওয়া সংক্রান্ত সংশোধনী আইন বাতিলের দাবিতে চলা দিল্লিতে ধারাবাহিক বিক্ষোভের জেরে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির অভিযোগ সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি মঙ্গলবার হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, প্রতিবাদ করার অধিকার সকলের রয়েছে, তাই বলে প্রতিবাদের নামে কোনও জায়গা দিনের পর দিন দখল করে রাখা যায় না।

দিল্লির ব্যবসায়ীরা উৎসবের মরসুমের বাকি দিনগুলিতে ব্যবসায় আর কোনও ‘ব্যাঘাত’ চাইছেন না। আগামী ১১ নভেম্বর (ভাইফোঁটা) পর্যন্ত তাই দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে সব ধরনের সমাবেশ, মিছিল, ধর্না নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এই মর্মে দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে চেম্বার অফ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিটিআই)। ওই বণিকসভার দাবি, গত এক মাসে (১ অক্টোবর-১১ নভেম্বর পর্যন্ত হিসেবে) ব্যবসায়ীদের নাকি প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গিয়েছে! যদিও রবিবার রামলীলা ময়দানের মঞ্চ থেকে ধারাবাহিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা গাঁধী। একই সুরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে বিঁধেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর দলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি, আরজেডি-র তেজস্বী যাদবের মতো বিরোধী নেতানেত্রীরা।

কী বলল সুপ্রিম কোর্ট

মঙ্গলবারের শুনানিপর্বে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘‘প্রতিবাদ ও ব্যবসা করার অধিকার— দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি অনির্দিষ্টকালের জন্য একটি জায়গা দখল করে রাখতে পারেন না। অন্য প্রতিবাদীরাও আছেন। কৃষক, ব্যবসায়ী বা আইনজীবীরা কোথায় যাবেন? প্রতিবাদ করার অধিকার সকলের আছে!’’

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর জ্ঞানেশের ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তাঁকে কেন্দ্র করে অন্তর্কলহের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি, গত ১০ মাসে জ্ঞানেশের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪ বার বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী এবং সুখবীর সিংহ সঁধু আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু আপত্তি না-মেনে, তাঁদের অন্ধকারে রেখে একক ভাবে জ্ঞানেশ একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই বিরোধী শিবির কোমর বেঁধেছে। পাশাপাশি আন্দোলনে নেমেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-সহ বিভিন্ন সংগঠনও। দিল্লিতে ধারাবাহিক ভাবে চলছে বিভিন্ন কর্মসূচি। লাগাতার এই প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ নিয়ে ইতিমধ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দিল্লির ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, এই বিক্ষোভের ফলে উৎসবের মরসুমে তাঁদের ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে। দোকানপাট বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

মঙ্গলবারের শুনানিতে সেই সব বিষয় উত্থাপিত হয় শীর্ষ আদালতে। শুনানির শুরুতেই দিল্লির ব্যবসায়ীদের পক্ষে আইনজীবী মুকুল রোহতগি উদ্বেগপ্রকাশ করেন। আদালতে তিনি বলেন, ‘‘উৎসবের মরসুমে এ ভাবে দিনের পর দিন দোকান বন্ধ থাকলে ব্যবসার ক্ষতি হয়।’’ বিক্ষোভ-কর্মসূচির কারণে দিল্লি পুলিশ কিছু জায়গায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারা জারি করে। আর সেই কারণে ওই সব এলাকার দোকান বন্ধ রাখতে হয়। দিল্লির ব্যবসায়ীদের এই উদ্বেগ নিয়ে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, ‘‘যাঁরা এই বিক্ষোভ কর্মসূচি করবেন, দায়িত্ব তাঁদের।’’ শুনানিতে এ-ও প্রশ্ন ওঠে, ‘‘ব্যবসার ক্ষতি বা বিক্রিতে ঘাটতির জন্য কি শুধু প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলিকে দায়ী করা যায়?’’

তা শুনে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘‘ব্যবসা এবং প্রতিবাদ— দুটোর অধিকারই গুরুত্বপূর্ণ।’’ তাঁর পরামর্শ, ‘‘গণপ্রতিবাদের জন্য এমন একটা জায়গা নির্দিষ্ট করা হোক, যেখানে কখনও কোনও ব্যবসায়ীর ক্ষতি হবে না!’’ আইনজীবী মুকুল দিল্লির ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘‘আমার মতে আগামী দু’মাস কোনও প্রতিবাদ বা ধর্না করা উচিত নয়।’’ আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘‘প্রতিবাদ করার অধিকার সকলের রয়েছে। তবে সেটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হওয়া উচিত।’’

সিজেপি প্রথমে চেয়েছিল যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি করতে। যদিও তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, যন্তর মন্তরে কোনও ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি করা যাবে না। বিকল্প হিসেবে তিনটি জায়গা বেঁধে দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। কেন যন্তর মন্তরে অনুমতি নয়, সেই প্রসঙ্গও ওঠে সুপ্রিম কোর্টে। এর জবাবে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল মেহতা আদালতে বলেন, ‘‘গত ২০ জুলাই যন্তর মন্তরে এক দিনের জন্য প্রতিবাদ কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই নির্দেশ মানা হয়নি। টানা সেখানে বিক্ষোভ চালানো হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা সেই স্থান দখল করে নিয়েছিলেন। এমনকি সংসদ অভিমুখে মিছিলও করেছিলেন।’’ তাঁর মতে, ‘‘সংসদ আর পাঁচটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। আপনি যেমন সুপ্রিম কোর্ট অভিযান করতে পারেন না, তেমন সংসদ অভিযানও করতে পারেন না।’’ দিনের পর দিন একই জায়গায় বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার বিপক্ষে অতীতে মন্তব্য করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০২১ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিনবাগের আন্দোলন নিয়ে এক মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালতের একই ধরনের পর্যবেক্ষণ ছিল। প্রতিবাদের অধিকারের কথা মেনে নিয়েও সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, ‘‘যত্রতত্র এবং যখন খুশি আন্দোলন করাটা মোটেই কাম্য নয়।’’

ব্যবসায়ী সংগঠনের হুঁশিয়ারি

রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে ‘ইন্ডিয়া’র সমাবেশের দিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার এলাকায় বহু দোকান বন্ধ ছিল। ওই সমাবেশে আগে থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল বণিকসভা। সমাবেশ শেষের সন্ধ্যায় তারা জানায়, বিরোধী জোটের সমাবেশের জেরে ব্যবসায়ীদের আনুমানিক ১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া যন্তর মন্তর, কনট প্লেস, পটেল চক এবং জনপথের আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভের জেরেও প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার লোকসান হয়েছে বলে দাবি বণিকসভার।

এ বার দিল্লির পুলিশপ্রধানকে চিঠি পাঠিয়ে পরিস্থিতির কথা ফের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে চেম্বার অফ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। বণিকসভার হুঁশিয়ারি, এই উৎসবের মরসুমে বিক্ষোভের জেরে ফের ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটলে, যাঁরা বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজকদের হাতেই দোকানের চাবি দিয়ে দেবেন ব্যবসায়ীরা। পুলিশকে পাঠানো চিঠিতে সংগঠনের চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়ল লিখেছেন, “ব্যবসায়ীরা আর নতুন করে কোনও লোকসান সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। এর পরেও যদি দীপাবলির ব্যবসায় ক্ষতি হয়, তা হলে বিক্ষোভ-মিছিলের আয়োজকদের হাতে দোকানের চাবি তুলে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।”

বণিকসভার বক্তব্য, দিল্লির প্রায় ২০ লক্ষ ব্যবসায়ী এবং ৭৫ লক্ষ কর্মীর কাছে আগামী কয়েক দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যবসার ওই ভরা মরসুমের বাকি দিনগুলিতে কনট প্লেস, যন্তর মন্তর, রামলীলা ময়দান, ইন্ডিয়া গেট, রাজঘাট বা দিল্লি গেটের আশপাশে কোনও প্রতিবাদ মিছিল বা সমাবেশে অনুমতি না-দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে তারা। বিকল্প হিসেবে প্রয়োজনে বুরাড়ি, আলিপুর, জাসোলা বা যমুনা খাদারের মতো এলাকাগুলি বিবেচনা করে দেখতে বলেছে তারা পুলিশকে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে দিল্লির ব্যবসায়ীরা বিরোধীদের সমাবেশে বিপুল জনসমাগমের কথা জানালেও তা মানতে নারাজ ডবল ইঞ্জিন সরকার ও শাসকদল। রামলীলা কর্মসূচিকে ‘ফ্লপ শো’ বলে কটাক্ষ করেছে তারা। বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, রামলীলা ময়দানে ভিড়ের ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।

সংক্ষেপে
  • মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে শনিবার কর্মসূচির ডাক দিয়েছে সিজেপি।
  • সিজেপির কর্মসূচিকে মাথায় রেখে শুক্রবার রাত থেকেই ধরপাকড় শুরু করেছে পুলিশ।
Supreme Court Delhi Police Traders CJP INDIA Alliance Gyanesh Kumar

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy